আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহুল আকাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এতে দেশের ৬০টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৫১টি অংশ নিচ্ছে। নিবন্ধন স্থগিত থাকায় ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের নির্বাচন করার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশে এর আগে ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। এসব নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ ছয়বার, বিএনপি চারবার এবং জাতীয় পার্টি দুবার সরকার গঠন করে।
আওয়ামী লীগ প্রথম, সপ্তম, নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে; বিএনপি দ্বিতীয়, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও অষ্টম সংসদ নির্বাচনে এবং জাতীয় পার্টি তৃতীয় ও চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়। তবে আওয়ামী লীগের শেষ তিনটি জয় নিয়ে চরম বিতর্ক হয়েছে। একতরফাভাবে বিনা ভোট, রাতের ভোট ও আমি-ডামি নির্বাচনের মাধ্যমে ওই তিনটি নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত এই দলটি।
সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, ষষ্ঠ ও এবং দ্বাদশ সংসদ মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। বিগত সংসদ নির্বাচনগুলোর মধ্যে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়ে। সর্বোচ্চ ৮৭ শতাংশ ভোট পড়ে এ নির্বাচনে। অন্যদিকে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে কম ভোট পড়ে। এ নির্বাচনে ২৬ দশমিক ৫০ শতাংশ ভোট পড়ে।
প্রথম সংসদ নির্বাচন
স্বাধীন দেশে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ সর্বপ্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ১৪টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। এই নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসন পেয়ে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। বিরোধীদের মধ্যে জাতীয় লীগ ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) একজন করে এবং স্বতন্ত্র পাঁচজন প্রার্থী বিজয়ী হন। এ নির্বাচনে ভোট পড়ে ৫৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। এ সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর ছয় মাস।
দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন
১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ২৯টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। নির্বাচনে ভোট পড়ে ৫১ দশমিক ২৯ শতাংশ। এই নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। অন্য দলগুলো পায় ৭৭টি আসন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ (মালেক) ৩৯টি, জাতীয় লীগ দুটি, আওয়ামী লীগ (মিজান) দুটি, জাসদ আটটি, মুসলিম ও ডেমোক্রেটিক লীগ ২০টি, ন্যাপ একটি, বাংলাদেশ গণফ্রন্ট দুটি, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল একটি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দল একটি ও জাতীয় একতা পার্টি একটি আসন পায়। নির্বাচিত বাকি ১৬ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। এ সংসদের মেয়াদ ছিল তিন বছর।
তৃতীয় সংসদ নির্বাচন
১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ১৫৩টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। ভোটের হার ছিল ৬৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। বিএনপি এ নির্বাচন বর্জন করে। অংশ নেয় ২৮টি রাজনৈতিক দল। জাতীয় পার্টি বাদে অন্য দলগুলো পায় ১১৫ আসন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ৭৬টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) পাঁচটি, ন্যাপ (মোজাফফর) দুটি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি পাঁচটি, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) তিনটি, জাসদ (রব) চারটি, জাসদ (সিরাজ) তিনটি, জামায়াতে ইসলামী ১০টি, মুসলিম লীগ চারটি ও ওয়ার্কার্স পার্টি তিনটি আসন পায়। বাকি ৩২ আসনে নির্বাচিত হন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এ সংসদের মেয়াদ ছিল ১৭ মাস।
চতুর্থ সংসদ নির্বাচন
১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এ নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচনে ভোট পড়ে ৫১ দশমিক ৮১ শতাংশ। জাতীয় পার্টি ২৫১টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। নির্বাচনে আটটি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। নির্বাচনে ১৯টি আসন পেয়ে সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসে সম্মিলিত বিরোধী দল (কপ)। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৫টি, জাসদ (সিরাজ) তিনটি ও ফ্রিডম পার্টি দুটি আসন লাভ করে। এ সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর সাত মাস।
পঞ্চম সংসদ নির্বাচন
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনের পর এটিই প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন, যেখানে প্রায় সব রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। নির্বাচনে দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ ৭৫টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। এই নির্বাচনে ভোট পড়ে ৫৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এ নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। এছাড়া আওয়ামী লীগ ৮৮টি, জাতীয় পার্টি ৩৫টি, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) পাঁচটি, জাসদ (সিরাজ) একটি, ইসলামী ঐক্যজোট একটি, জামায়াতে ইসলামী ১৮টি, সিপিবি পাঁচটি, ওয়ার্কার্স পার্টি একটি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি) একটি, গণতন্ত্রী পার্টি একটি ও ন্যাপ (মোজাফফর) একটি আসন পায়। স্বতন্ত্র প্রার্থী তিনটি আসনে জয়লাভ করেন। সংসদের মেয়াদ ছিল চার বছর আট মাস।
ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দলীয় সরকারের অধীনে হওয়া এ নির্বাচন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামীসহ অনেক দল বর্জন করে। ৪১টি রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশ নেয়। বিএনপি ২৭৮টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। নির্বাচনে ফ্রিডম পার্টি একটি আসন পায়। বাকি ১০ আসনে জয়লাভ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এছাড়া ১০টি আসনে ফলাফল অসমাপ্ত ছিল এবং একটি আসনের নির্বাচন আদালতের আদেশে স্থগিত করা হয়। এ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ২৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এ সংসদের মেয়াদ ছিল ১১ দিন। এই সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস হয়।
সপ্তম সংসদ নির্বাচন
১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার যুক্ত করার পর এটিই প্রথম নির্বাচন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসনে জয়লাভ করে। নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৭৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ৮১টি রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। অন্য দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ১১৬টি, জাতীয় পার্টি ৩২টি, জামায়াতে ইসলামী তিনটি, ইসলামী ঐক্যজোট একটি এবং জাসদ একটি আসন পায়। স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়লাভ করেন একটি আসনে। সংসদের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর।
অষ্টম সংসদ নির্বাচন
২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। ৫৪টি রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশ নেয়। বিএনপি বাদে অন্য দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ ৬২টি, জামায়াতে ইসলামী ১৭টি, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ১৪টি, জাতীয় পার্টি (না-ফি) চারটি, জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) একটি, ইসলামিক ঐক্যজোট দুটি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ একটি আসন পায়। বাকি ছয় আসনে জয়লাভ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। সংসদের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৭৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
নবম সংসদ নির্বাচন
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন পদ্ধতি চালু হওয়ার পর এটি প্রথম ভোট। এতে ৩৮টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ৩০টি, জাতীয় পার্টি ২৭টি, জাসদ তিনটি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি দুটি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) একটি, জামায়াতে ইসলামী দুটি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) একটি আসন পায়। স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয় চার আসনে। নির্বাচনে ভোট পড়ে ৮৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।
দশম সংসদ নির্বাচন
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করাকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলোর ব্যাপক আন্দোলনের মুখে এই নির্বাচন আয়োজন করে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনটি বর্জন করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ বিরোধী দল। এ নির্বাচনে ১২টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পায় আওয়ামী লীগ এবং এর শরিক দলগুলো। ফলে ১৪৭টি আসনে ভোট গ্রহণ হয়। আওয়ামী লীগ একাই ২৩৪টি আসন পায়। জাতীয় পার্টি ৩৪টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ছয়টি, জাসদ (ইনু) পাঁচটি, তরীকত ফেডারেশন দুটি, জাতীয় পার্টি (জেপি) দুটি, বিএনএফ একটি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১৬টি আসনে জয়লাভ করে। নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৪০ দশমিক ০৪ শতাংশ। এই নির্বাচনটি বাংলাদেশে বিনাভোটের নির্বাচনের তকমা পায়।
একাদশ সংসদ নির্বাচন
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় একাদশ সংসদ নির্বাচন। এতে ৩৯টি নিবন্ধিত দলের সবাই অংশ নেয়, প্রার্থী ছিলেন এক হাজার ৮৬৫ জন। তবে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে নির্বাচনটি বিতর্কিত হয়ে পড়ে এবং আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরবর্তী সময়ে নির্বাচনটি ‘রাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিত হয়। এ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৮০ দশমিক ২০ শতাংশ। আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৫৮টি আসন পায়। জাতীয় পার্টি ২২টি এবং মহাজোটভুক্ত অন্য দলগুলো আটটি আসনে জয়ী হয়। অপরদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত বিএনপি ছয়টি, গণফোরাম দুটি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তিনটি আসনে জয়ী হন।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন
আওয়ামী লীগের টানা ১৬ বছরের শাসনামলে অনুষ্ঠিত তৃতীয় এবং সর্বশেষ নির্বাচন। বিএনপি এই নির্বাচনটি বর্জন করে এবং একতরফা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবারো বিজয়ী হয়। নির্বাচনে দেশের ৪৪টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ২৮টি দল অংশ নেয়। এতে প্রার্থী ছিল ১৯৬৯ জন। নির্বাচনে ৪১ দশমিক ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে। অবশ্য ভোটের দিন বিকাল তিনটায় ২৭ শতাংশ ভোট পড়ার কথা জানানো হলেও পরদিন ৪২ শতাংশ ভোট পড়ার কথা জানানো হয়। ওই নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার সাত মাসের মাথায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয়। শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে চলে যান।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

