লেবাননে ইসরাইলের একের পর এক বিমান হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সেখানকার বাংলাদেশিদের জীবন। হামলায় বহু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে কর্মক্ষেত্র ও জীবিকার প্রধান উৎসগুলো। জীবন ঝুঁকির পাশাপাশি কাজ সংকটে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন তারা। সবকিছু মিলিয়ে নানামুখী সংকটে লেবাননে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা।
তথ্যমতে, দক্ষিণ লেবাননের সুর ও নাবাতি অঞ্চলে বাংলাদেশিদের বসবাস। মূলত শিয়া মুসলিমপ্রধান এলাকাটি কৃষির জন্য বেশ পরিচিত। এছাড়া বৈরুতের উপশহর দাহিয়্যে হিজবুল্লাহর অন্যতম প্রধান ঘাঁটি হওয়ায় ইজরাইলের হামলা এ অঞ্চলগুলোতে বেশি হচ্ছে।
ওই অঞ্চলের প্রবাসীরা বলছেন, ইসরাইলি হামলায় খুব কাছ থেকে মৃত্যুকে দেখেছেন তারা। একের পর এক হামলার কারণে আশ্রয়ের জন্য নিরাপদ জায়গা পাচ্ছেন না। প্রাণ রক্ষায় তারা আশপাশের অঞ্চলের পরিচিতজনদের কাছে গেছেন। কিন্তু সেখানেও দেখা দিয়েছে বিপর্যয়। বিভিন্ন কোম্পানি এবং কারখানা বন্ধ হওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন অনেকে।
প্রবাসীরা জানান, খোলা আকাশের নিচে তাঁবু টানিয়ে থাকতে হচ্ছে তাদের। দূতাবাসের সহায়তা খুবই নাজুক। এছাড়া প্রথম কদিন সংকট না থাকলেও দিন যত যাচ্ছে খাবারের সংকট বাড়ছে। তবে বৈরুতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বলছে, প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও খাদ্য সংকট নিরসনে সার্বক্ষণিক সহায়তা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রায় এক হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে তারা বিভিন্নভাবে মানবিক সহায়তা করেছে। এছাড়া বিপদের সংকেত পাওয়া মাত্রই দূতাবাস থেকে বাঙালি কমিউনিটি এবং অনলাইনভিত্তিক গ্রুপের মাধ্যমে সতর্ক করা হচ্ছে।
জানা গেছে, ৪০ দিনের বেশি সময় ধরে চলা হামলায় লেবাননের কোনো স্থানই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননের হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কর্মরত প্রবাসীরা বোমা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
দূতাবাস সূত্র জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল থেকে যেসব প্রবাসী অন্য অঞ্চলে সরে গেছেন, তাদের মধ্যে অনেকে পরিচিতজনের কাছে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে লেবানন সরকার থেকেও আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এখানে সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হচ্ছে। ফলে লেবানন ও বাংলাদেশিদের মধ্যে অভ্যাসগত এবং খাবারের দিক থেকে ভিন্নতা থকায় মানিয়ে নেওয়াটা বেশ জটিল হয়ে পড়েছে। যার ফলে বাংলাদেশিদের মধ্যে অনেকে গ্রুপ হয়ে তাঁবু টানিয়ে বাস করছেন।
রেজাউল করিম নামে এক প্রবাসী জানান, ‘আমরা সব সময় ভয় আর আতঙ্কে আছি। সবাই কর্মহীন হয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। ৮ তারিখে ইসরাইলের বিমান হামলায় দীপালি বেগম নামে বাংলাদেশি প্রবাসী এক কর্মী কফিলের পরিবারসহ নিহত হয়েছেন। এমন মৃত্যু সব সময় আমাদের তাড়া করছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের মধ্যে বেশিরভাগই এখন বাস্তুচ্যুত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তাঁবু টানিয়ে বাস করছেন। কেউ আবার পরিচিত বাঙালিদের কাছে গেছেন আশ্রয়ের জন্য। মোট কথা, এখানে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।’
বাংলাদেশ দূতাবাস, বৈরুতের প্রথম সচিব ও দূতাবাসপ্রধান আনোয়ার হোসাইন আমার দেশকে বলেন, বাংলাদেশ দূতাবাস লেবাননে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়েছে। শিয়া অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে ইসরাইল আক্রমণ চালাচ্ছে বেশি। এর মধ্যে বৈরুতের দাহিয়্যে অন্যতম। এটি হিজবুল্লাহর অন্যতম ঘাঁটি। মূলত এসব অঞ্চলে যেসব প্রবাসী বাস করতেন, তারা ঝুঁকিতে ছিলেন।
আনোয়ার হোসাইন বলেন, ‘আমরা সব সময় খোঁজ-খবর রাখছি। যখনই খবর পাচ্ছি কেউ সমস্যায় আছে, সঙ্গে সঙ্গে সহায়তা পাঠাচ্ছি। আমাদের পক্ষ থেকে কোনো ত্রুটি নেই। এছাড়া বাংলাদেশি কমিউনিটির মাধ্যমেও আমাদের সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর জেরে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

