ভূপৃষ্ঠের ছয় কিলোমিটার গভীরে গ্যাস অনুসন্ধান শুরু হচ্ছে

এম এ নোমান

ভূপৃষ্ঠের ছয় কিলোমিটার গভীরে গ্যাস অনুসন্ধান শুরু হচ্ছে

তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ভূপৃষ্ঠের ছয় কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত খননযন্ত্র পাঠাচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত সব প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস, কুমিল্লার বাখরাবাদ ও শ্রীকাইল এবং পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার মোবারকপুরে একটি করে কূপ অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। মাটির এত নিচে গিয়ে গ্যাস অনুসন্ধানের ঘটনা দেশের ইতিহাসে এটিই প্রথম। পেট্রোবাংলা সূত্র আমার দেশকে এ তথ্য জানিয়েছে।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, এর আগে দেশে চার কিলোমিটার মাটির নিচ পর্যন্ত অনুসন্ধান পরিচালনা করেছে। এবারই প্রথম আমরা সেই ধারা ভেঙে আরো গভীরে গিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ইতোমধ্যে একটি কূপে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

খনন কাজ তদারকির সঙ্গে যুক্ত পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, আমরা সাধারণত দুই হাজার ৬০০ মিটার থেকে চার হাজার মিটার (চার কিলোমিটার) গভীর পর্যন্ত কূপ খনন করে গ্যাস উত্তোলন করে থাকি। তবে ফেঞ্চুগঞ্জ-২-সহ কিছু কূপে চার হাজার ৯০০ মিটার পর্যন্ত খনন করা হয়েছে। গ্যাস স্তরের নিচে রয়েছে কঠিন শিলা। এর নিচেও গ্যাস স্তর থাকতে পারে বলে বাপেক্সের একটি ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) জরিপে বলা হয়েছে।

শ্রীকাইলে ৯২৬ বিসিএফ (বিলিয়ন ঘনফুট) আর তিতাসে এক হাজার ৫৮৩ বিসিএফ গ্যাস থাকতে পারে বলে ওই জরিপে বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে মজুতের পরিমাণ আড়াই টিসিএফের (ট্রিলিয়ন ঘনফুট) মতো হতে পারে বলে জানান তিনি।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির (বিজিএফসিএল) দুটি এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) দুটি কূপে গভীর খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে—বিজিএফসিএলের তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ৩১ নম্বর এবং বাখরাবাদ-১১ নম্বর কূপ। বাপেক্সের দুটি হচ্ছে শ্রীকাইল ও মোবারকপুর।

পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, সাইসমিক সার্ভেতে বড় ধরনের সম্ভাবনা দেখা যাওয়ার কারণে তিতাস-৩১ ও বাখরাবাদ-১১-তে পাঁচ হাজার ৬০০ মিটার পর্যন্ত খনন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ হোসেন বলেন, বিষয়টি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আর ডিপ ড্রিলিং করে খুব ভালো ফল পাওয়ার রেকর্ড কমই দেখা যাচ্ছে। ভারতের কৃষ্ণা গোদাবেড়ি বেসিনে পানির গভীরতা আড়াই হাজার মিটার, এরপর সাড়ে চার হাজার মিটার মাটি খনন করা হয়। সব মিলিয়ে সাত হাজার মিটারের মতো খনন করেছে। গ্যাস পেয়েছে টাইড সেন্ড পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ সাত মিলিয়ন করে উত্তোলন করতে পারবে। রাশিয়ান কোম্পানি গ্যাজপ্রম আজারবাইজানে ছয় হাজার মিটারে গেলে, হাইপ্রেসার ড্রিলিং করে আশানুরূপ ফল পায়নি।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ ভূখণ্ডে স্বাধীনতার পর মাত্র ৪৩টির মতো অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে। প্রতিবেশী ত্রিপুরা রাজ্যে ছোট্ট আয়তনে কূপ খনন করেছে ১৬০টি। এতগুলো কূপ খনন করে মাত্র ১১টি গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কার করেছে। এর মধ্যে সাতটি থেকে উৎপাদন করছে। বাংলাদেশ সীমানায় ১১৩ বছরে ৯৮টি কূপ খননের মাধ্যমে ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছে। দেশে দুই দশক ধরে গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে সমীক্ষা বা অনুসন্ধান—কোনোটাই হয়নি বলে জানান কর্মকর্তারা।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) শক্তি ও সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। ফলে বিপুল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি না পাওয়ায় ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে জ্বালানি খাত।

গ্যাসের অনুসন্ধান কার্যক্রমে বিগত আওয়ামী সরকারের নীরবতাকে রহস্যজনক উল্লেখ করে এ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলেন, গ্যাস অনুসন্ধান ও নতুন সমীক্ষা না চালিয়ে দেশবাসীকে জিম্মি করে আওয়ামী লীগ সরকার জ্বালানি খাতে লুটপাট চালিয়েছে। গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ রেখে ঘাটতি মেটাতে মাত্র আট বছরে দুই লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হয়েছে।

ছয় কিলোমিটার গভীরে গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগকে সরকারের একটি সাহসী পদক্ষেপ বলে মনে করেন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক। আমার দেশকে তিনি বলেন, গ্যাস অনুসন্ধানে আমাদের চেষ্টা করে যেতে হবে। বাপেক্স পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে নিশ্চিত হয়ে আমরা এত গভীরে অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিয়েছি।

দেশে গ্যাস সংকট নিরসনে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান আরো বলেন, দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধিতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় মোট ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, পেট্রোবাংলার ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মপরিকল্পনার আওতায় ২৫টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিদিন ২৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে এবং বর্তমানে দৈনিক ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানান চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, উৎপাদন-বণ্টন চুক্তির আওতায় স্থলভাগ ও সমুদ্র অঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে পেট্রোবাংলার প্রস্তুত করা ‘অনশোর মডেল পিএসসি-২০২৬’ ও ‘অফশোর মডেল পিএসসি-২০২৬’ চূড়ান্ত অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন। পেট্রোবাংলার গৃহীত কর্মপরিকল্পনার আওতায় সব কূপ খনন কাজের সফল সমাপ্তিতে আনুমানিক তিন ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন