আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

আ.লীগ নেতা সুমন, ১৫ বছরে কামিয়েছেন শত শত কোটি টাকা

হাসান উল আজিজ, লালমনিরহাট

আ.লীগ নেতা সুমন, ১৫ বছরে কামিয়েছেন শত শত কোটি টাকা

চোরাচালান, চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক, স্বর্ণ পাচার, হুন্ডি ব্যবসা আর হুমকি-ধমকিতে ১৫ বছরে শত শত কোটি টাকা কামিয়েছেন লালমনিরহাটের আওয়ামী লীগ নেতা সাখাওয়াত হোসেন ওরফে হুন্ডি সুমন খান। পেটোয়া বাহিনী গড়ে তুলে হয়েছিলেন অপরাধচক্রের এক আলোচিত নাম ‘গডফাদার’। জ্ঞাত আয়ের বাইরে সুমনের ব্যাংক হিসাবে মিলেছে ৪৬৫ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ফ্যাসিবাদ বিদায়ে নতুন বাংলাদেশ হওয়ায় সে আত্মগোপনে চলে যান।

বিগত ১১ নভেম্বর রাতে লালমনিরহাট থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় তিস্তা সড়ক সেতুর টোল প্লাজা থেকে আলোচিত-সমালোচিত এই আ.লীগ নেতাকে গ্রেফতার করে লালমনিরহাট জেলা পুলিশ। সম্প্রতি তার স্থাবর সব সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছে জেলা ও দায়রা জজ আদালত। সাখাওয়াত হোসেন সুমন খান লালমনিরহাটবাসীর কাছে এক আতঙ্কের নাম। তার ছিল একাধিক ক্যাডার বাহিনী। এদের দিয়ে মাদক ব্যবসা ও টেন্ডার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। তার ভয়ে কেউ কথা বলার সাহস পেত না। ১৯৯৬ সালে তিনি আ.লীগে যোগদান করেন। এরপর শুরু করেন হুন্ডি ব্যবসা, মাদক, গরু পাচার, জমি দখল, অস্ত্রের মুখে চাঁদাবাজি। বিশেষ করে গত ১৫ বছরে হয়েছেন অঢেল সম্পদের মালিক। গড়ে তোলেন নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। তার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলেই তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হতো, হাজির করা হতো সুমন খানের বিডিআর গেট কালিবাড়ীতে অবস্থিত খান হোটেলে। পরবর্তীতে মুচলেকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হতো।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি সুমন খানের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ৪৬৫ কোটি টাকা ব্যাংক হিসাবে লেনদেনের তথ্য পায় সিআইডি। যার মধ্যে ১৮৬ কোটি টাকার সন্ধান মেলে তার কর্মচারী তৌকির আহমেদ মাসুমের ব্যাংক হিসাবে। এ ঘটনায় মামলা করেছেন সহকারী পুলিশ সুপার (সিআইডি), লালমনিরহাট। তার নামে হত্যাসহ পৃথক ১৬ মামলা রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন লালমনিরহাট সদর থানার ওসি আব্দুল কাদের।

সুমন খানের ১৫ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বড় অঙ্কের লেনদেন সন্দেহজনক। রেলের জমিতে অবৈধভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ, শহরে হোটেল-রেস্টুরেন্ট, ছয়টি আলিশান ভবন, সঞ্চয়পত্র, চাতাল, ট্রাক, প্রাইভেটকারসহ নামে-বেনামে গড়েছেন অঢেল সম্পদ।

সুমন খান লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা শহরের কালীবাড়ি মাস্টারপাড়া এলাকার মৃত বাচ্চু খানের ছেলে। অনুসন্ধানে সুমন খানের ব্যাংকে ২৩৭ কোটি ৪৯ লাখ ৪৮ হাজার ৭০০ টাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তার স্ত্রী নাহিদা আক্তার রুমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৩৫ হাজার ৩১০ টাকার সন্ধান মেলে। এছাড়া সুমন খানের কর্মচারী লালমনিরহাট পুরান বাজার এলাকার বাসিন্দা হারুনের ছেলে তৌকির আহমেদ মাসুমের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১৮৬ কোটি ৯২ লাখ ৬১ হাজার ১২৭ টাকা পাওয়া গেছে। বৈধ আয়ের উৎস না থাকলেও তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা, স্থানান্তর ও রূপান্তর করা হয়। এসব অপরাধে ২০১৫ সালের মানিলন্ডারিং আইনের ৪(২) ধারায় তাদের তিনজনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

লালমনিরহাট শহরের কালিবাড়ী এলাকার মনছুর আলী বলেন, আ.লীগ ক্ষমতায় আসার পর ওপর মহলের সঙ্গে ভালো সম্পর্কের সুবাদে জেলা আ.লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেন সুমন খান। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আ.লীগ আমলের দূর্নীতির যে উৎসব শুরু হয়েছিল, সেই দুর্নীতির টাকার একটি অংশ পেতেন আ.লীগের প্রথম সারির বেশ কজন প্রভাবশালী নেতা। তবে নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতে অধিকাংশ সম্পদই নিজের নামে করেননি। সবই করেছেন স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজনদের নামে।

লালমনিরহাট শহরের পুরান বাজার এলাকার ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন বলেন, মাদক, চোরাচালান, হুন্ডি ব্যবসা করে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন সুমন খান, গড়ে তুলেছিলেন বিশাল পেটোয়া বাহিনী। তার বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ কথা বলার সাহস পেত না। তিনি অকপটে স্বীকার করেন, এখন আর আমাদের কোনো ভয় নেই, ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে আমরা একটা নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি। ফ্যাসিবাদ বিদায় হয়েছে। এখন আর কথা বলতে কোনো ভয় নেই। যারা সুমন খানের মতো নেতার জন্ম দিয়েছে, তাদের বিচার হওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন।

লালমনিরহাটের সিনিয়র সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম রফিক আমার দেশকে বলেন, সুমন খানের বাবা মৃত বাচ্চু খান ১৯৮৪-৮৫ সালে গ্রামের বাজারে ঘুরে ঘুরে পুরোনো কাপড় সেলাইয়ের কাজ করতেন। কিন্তু পরবর্তীকালে জড়িয়ে পড়েন চোরাচালান ব্যবসার সঙ্গে।

লালমনিরহাটের সহকারী পুলিশ সুপার (সিআইডি) মোহাম্মদ আব্দুল হাই সরকার জানান, মানিলন্ডারিং আইন অনুযায়ী সুমন খানের সব অবৈধ সম্পদ ক্রোকের আবেদন করা হয় লালমনিরহাট বিশেষ জজ আদালতে। আদালত তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার জন্য জেলা প্রশাসক লালমনিরহাটকে নির্দেশ দেয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন