পঞ্চগড়ে প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না চা চাষিরা। এতে করে চা-বাগানে লোফার ও লাল মাকড় পোকার আক্রমণে সবুজ পাতা রক্ষার্থে দিশাহারা চাষিরা।
জানা গেছে, পঞ্চগড়সহ রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলায় কৃষি বিভাগে চা-শিল্পের জন্য কোনো সার বরাদ্দ না থাকায়, ইউরিয়া ও ডেপ সারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যে কারণে কাঁচা সবুজ পাতা তোলার ভরা মৌসুমে সঠিক সময়ে বাগানে সার দিতে পারছে না চাষিরা। এছাড়া চা-পাতায় লোফার ও লাল মাকড় রোগের উপদ্রব বাড়ায় বাগান রক্ষার্থে দিশাহারা উত্তরাঞ্চলে সমতলের চা-চাষিরা। বাংলাদেশ চা বোর্ড, পঞ্চগড় অফিসের ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী উত্তরবঙ্গ রংপুর বিভাগের আটটি জেলার মধ্যে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী ও লালমনিরহাটসহ পাঁচটি জেলায় মোট ক্ষুদ্রায়তন চা-বাগানের সংখ্যা ৮ হাজার ৪০১টি। এর মধ্যে বড় নিবন্ধিত চা-বাগান ১২টি এবং ১৮টি অনিবন্ধিত চা-বাগান। এছাড়া ক্ষুদ্রায়তন নিবন্ধিত চা-বাগান ২ হাজার ২২৫টি এবং অনিবন্ধিত ক্ষুদ্রায়তন চা-বাগানের সংখ্যা ৬ হাজার ১৪৬টি রয়েছে। এসব বাগানে মোট উৎপাদিত কাঁচা সবুজ চা পাতার পরিমাণ ৯ কোটি ৭৭ লাখ ৪৬ হাজার ৬১১ কেজি। উৎপাদিত সবুজ কাঁচা পাতা থেকে পঞ্চগড়ে ৩০টি এবং ঠাকুরগাঁওয়ে একটিসহ মোট ৩১টি চা কারখানায় মোট ২ কোটি ২ লাখ ৪২ হাজার ৫২ কেজি তৈরিকৃত চা উৎপন্ন হয়েছে। যা জাতীয় উৎপাদনে শতকরা পার্সেন্ট হার ২১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বিগত বছরের তুলনায় সমতলে চা আবাদ বেড়েছে ৭৩ দশমিক ২ একর এবং ৫৮ দশমিক ১ লাখ সবুজ কাঁচা পাতা বেশি উৎপাদন হয়েছে।
তেঁতুলিয়া সদরের মাগুড়া গ্রামে চা-চাষি আব্দুল লতিফ জানান, আবহাওয়া ও জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে বাগানে মশক, লাল মাকড়, কারেন্ট পোকা ও লোফারসহ নানা জাতের পোকা আর মাত্রাতিরিক্ত পাতা ও ডগার কুঁড়ি পচন রোগবালাইয়ের আক্রমণ বেড়েছে। এখন বাগান টিকিয়ে রাখতে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ বেড়েছে। কিন্তু সঠিক সময়ে সার ও কীটনাশক না পেয়ে বাগানে পরিচর্চা এবং ভালো পাতা উৎপাদনে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সার ও কীটনাশকের জন্য জেলা ও উপজেলা কৃষি অফিসে গেলে সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তা বলেন, চা-শিল্পের সার ও কীটনাশক আমাদের কাছে বরাদ্দ নেই। নিরুপায় হয়ে চা-চাষিরা ফিরে আসছে। তেঁতুলিয়ার চা-চাষি আব্দুল লতিফ, হাফিজুর রহমান, হবিবর রহমান এবং পঞ্চগড় সদরের শাহজালাল, রফিক চা চাষিরা একই অভিযোগ করেন। এই চাষিরা জানান, সরকার আমাদের কাছ থেকে টেক্স ও ভ্যাট ঠিকই আদায় করেন । কিন্তু আমাদের দুঃখ বুঝার ক্ষমতা তাদের বোধগম্য হয় না।
পঞ্চগড় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, উপপরিচালক কৃষিবিদ আব্দুল মতিন জানান, চা একটি শিল্প এবং অর্থকরী ফসল। সার বরাদ্দ দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা শিল্প মন্ত্রণালয়। কৃষি বিভাগ শুধু কৃষি উৎপাদনের জন্য জেলায় প্রয়োজনীয় সার বরাদ্দ চেয়ে থাকে। কিন্তু চা-চাষের জন্য প্রতি রাউন্ডে বিপুল পরিমাণ সারের প্রয়োজন। বরাদ্দ না থাকায় চা-চাষিরা সার পাচ্ছে না। এক্ষেত্রে উত্তরাঞ্চলের চা-চাষিদের জন্য বাংলাদেশ চা বোর্ড সার চেয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে, চা-চাষিদের সমস্যা লাঘব হবে।
বাংলাদেশ চা বোর্ড, পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমির হোসেন বলেন, সিলেট অঞ্চলে চা বাগানে চাষিদের জন্য বাংলাদেশ চা বোর্ড সেখানকার কারখানার মালিকদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সার বরাদ্দ দেন এবং কারখানা থেকে চা-চাষিরা ন্যায্য দামে নিতে পারেন। কিন্তু উত্তরাঞ্চলের সমতলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি চা-চাষিদের সেই প্রক্রিয়ায় সার প্রদান করা একটু কষ্টসাধ্য। কারণ এই চা-চাষিরা সবাই এখনো নিবন্ধন করেননি। কারণে উত্তরাঞ্চলে চা কারখানার মালিকেরা সার নিতে পারছেন না। তবে আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শিল্প মন্ত্রণালয়ে একটি চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলার চা-চাষিরা প্রয়োজনীয় সার ও কীটনাশক বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের আশু দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

