আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

রাজশাহীর ৩৮৯ বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক

মঈন উদ্দিন, রাজশাহী

রাজশাহীর ৩৮৯ বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক

রাজশাহী জেলার ১ হাজার ৫৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৮৯টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য, আবার এর মধ্যে ৬১টি বিদ্যালয়ের পদ আটকে আছে মামলা-সংক্রান্ত জটিলতায়। যা জেলার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় এক ভয়াবহ শূন্যতা তৈরি করেছে। বছরের পর বছর ধরে পদোন্নতি ও নিয়োগ বন্ধ থাকায় এই সংকট আরো গভীর হয়েছে।

এতে প্রশাসনিক অচলাবস্থা, শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা শুধু একটি স্তর নয় এটি ভবিষ্যৎ জাতি গঠনের ভিত্তি। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে পুরো কাঠামোই ভেঙে পড়বে। তাই রাজশাহীর এই ৩৮৯টি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগ এখন সময়ের দাবি নয়, জাতীয় দায়িত্ব।

বিজ্ঞাপন

জেলার ৯টি উপজেলা এবং মহানগর এলাকার প্রায় প্রতিটি প্রান্তেই এই সংকট রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থা বাগমারা উপজেলায়, যেখানে সর্বোচ্চ ৯৭টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। এর পরই রয়েছে গোদাগাড়ী, সেখানে ৭১টি বিদ্যালয়ে একই অবস্থা। এছাড়া তানোরে ৬২টি, চারঘাটে ৩৮টি, পুঠিয়ায় ২৭টি, বাঘায় ২২টি, পবায় ২১টি, দুর্গাপুরে ২১টি, মোহনপুরে ২০টি এবং বোয়ালিয়া থানা এলাকায় ১০টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই।

এই বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু তাদের হাতে নেই প্রশাসনিক ক্ষমতা, নেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ। ফলে বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রম থেকে শুরু করে শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

শিক্ষকদের দায়িত্ব বেড়েছে, কিন্তু ক্ষমতা নেই উল্লেখ করে পবা উপজেলার ভালাম ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নফুরা খাতুন বলেন, প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে আমরা যারা দায়িত্ব নিচ্ছি, তাদের হাতে ক্ষমতা নেই।

অথচ মিড-ডে মিল, সরকারি ডেটা আপলোড, সভা, অভিভাবক সংযোগÑসবকিছু সামলাতে হচ্ছে। পাঠদানে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

একই ধরনের চাপের কথা জানালেন পবার কালুপাড়া মাধাইপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাসুমা আক্তার। তার কথায়, ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি ঠিকই, কিন্তু একজন সহকারী শিক্ষকের পক্ষে প্রশাসনিক সব দায়িত্ব সামলানো অত্যন্ত কঠিন।

পূর্ণ ক্ষমতা না থাকায় অনেক জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। এতে স্কুলের সার্বিক মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও মানোন্নয়ন সব কিছুতে ভাটা পড়েছে।

শুধু শিক্ষকরা নন, হতাশ অভিভাবকরাও। পবা উপজেলার নওহাটা পৌর এলাকার অভিভাবক রাসেদুল ইসলাম বলেন, প্রধান শিক্ষক না থাকলে স্কুলের দেখভাল কে করবে? শিক্ষকরা ক্লাস নেবেন, নাকি অফিসের কাজ করবেন? সমস্যা হলে কাকে বলব তাও জানি না। ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়েও খুব দুশ্চিন্তায় আছি।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২০১৮ সাল থেকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি প্রক্রিয়া একেবারেই বন্ধ রয়েছে। প্রতি বছর বহু শিক্ষক অবসরে গেলেও নতুন নিয়োগ কিংবা পদোন্নতির কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

রাজশাহী জেলা সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. হারুন অর রশিদ বলেন, ২০১০ সালের পর সরাসরি প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ২০১৮ সালে কিছু সহকারী শিক্ষককে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তারাও এখন অবসরে গেছেন। ফলে প্রধান শিক্ষক পদে ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। অবিলম্বে পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণ করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন পূর্ণকালীন প্রধান শিক্ষক থাকা আবশ্যক। এই সংকটে কোমলমতি শিক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

এ বিষয়ে রাজশাহী জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) টুকটুক তালুকদার বলেন, শিক্ষা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কিন্তু প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আমরা নিয়মিতভাবে শূন্য পদের তালিকা পাঠাচ্ছি, কিন্তু পদোন্নতি না হওয়ায় সংকট কাটছে না।

তিনি আরো বলেন, সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব নিলেও তাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তারা নিতে পারেন না। তদারকি, অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন, প্রশাসনিক যোগাযোগ সবকিছুতেই স্থবিরতা নেমে এসেছে। আমরা আশা করছি, এই পরিস্থিতির দ্রুতই সমাধান হবে।

এ সম্পর্কে রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ.কে.এম আনোয়ার হোসেনের মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। স্থানীয় শিক্ষা বিভাগের এই নীরবতা ও সমন্বয়ের ঘাটতি দায়বদ্ধতার অভাবের ইঙ্গিত দেয় বলে মন্তব্য করেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষাবিদ ও শিশুবিকাশ গবেষক আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন একজন দক্ষ প্রধান শিক্ষক। নেতৃত্বহীন বিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ ধরে রাখা যায় না। এতে শিশুরা শেখার আগ্রহ হারায়। নিয়মিত ক্লাস না হলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

তিনি আরো বলেন, শুধু পদোন্নতি নয়, জরুরি ভিত্তিতে সরাসরি নিয়োগ চালু করতে হবে। তা না হলে রাজশাহীর এই সংকট অন্যান্য জেলাতেও ছড়িয়ে পড়বে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন