চসিকের সবচেয়ে বড় ফুটওভার ব্রিজে সংকীর্ণ সিঁড়ি, সমালোচনা

চসিকের সবচেয়ে বড় ফুটওভার ব্রিজে সংকীর্ণ সিঁড়ি, সমালোচনা

পথচারীদের নির্বিঘ্নে সড়ক পারাপারের জন্য ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। এ প্রকল্পের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ে প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে একটি ব্রিজ। তবে সিঁড়ির সংকীর্ণতা, চলাচল পথের বিন্যাস এবং নকশা পরিবর্তনের অভিযোগে উদ্বোধনের আগেই সমালোচনার মুখে পড়েছে চসিকের এ প্রকল্প।

একই সঙ্গে নগরে আরো ৩৪টি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগেও চলছে ধীরগতি। বিদ্যুৎ ও অন্যান্য ইউটিলিটি লাইনের বাধায় অধিকাংশ ব্রিজের নির্মাণকাজ শুরু করা যায়নি। তবে চসিকের দাবি, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই ব্রিজগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সূত্র জানায়, চসিকের ‘এয়ারপোর্ট রোডসহ বিভিন্ন সড়ক উন্নয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় নগরে ৩৮টি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টি ব্রিজের কাজ প্রকল্পের আওতায় এসেছে। ছয়টির নির্মাণকাজ ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। ১৫টির দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও ইউটিলিটি লাইনের বাধায় কাজ শুরু করা যায়নি।

চসিকের প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, গ্যাসলাইন, টেলিফোন লাইনসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে টেন্ডার শুরু হলেও কাজে হাত দেওয়া যাচ্ছে না। এতে সঠিক সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়া নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে তাদেরও।

প্রকৌশল বিভাগ সূত্র জানায়, নগরীর মুরাদপুর, জিইসি, দুই নম্বর গেট, বহদ্দারহাট, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, অক্সিজেন, টেকনিক্যাল মোড়, দেওয়ানহাট, চৌমুহনী, বাদামতলী, বারিক বিল্ডিং, নিমতলা, অলংকার ও একে খানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ৫৮ কোটি ছয় লাখ ৩০ হাজার টাকা। তবে ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে ৩৭ কোটি ৩৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকায়।

নকশা নিয়ে প্রশ্ন

নগরবাসীর অভিযোগ, জনাকীর্ণ এলাকায় মূল নকশা পরিবর্তন করে ব্যয় অপরিবর্তিত রেখেই ব্রিজটি নির্মাণ করা হচ্ছে। জিইসি মোড়ে বিশেষ ফুটওভার ব্রিজ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে হচ্ছে সাধারণ ফুটওভার ব্রিজের মতো। যেখানে প্রতি মিনিটে ২০ জন ওঠার চাপ রয়েছে, সেখানে ব্রিজ করা হয়েছে দুজন সক্ষমতার। শুধু তাই নয়, বিদ্যমান কাঠামোতে যেকোনো একটি পয়েন্টে উঠলে চৌরাস্তার যেকোনো পয়েন্টে সহজে নামার সুবিধা থাকবে না। প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে চসিকের একটি সাধারণ ফুটওভার ব্রিজের নির্মাণ ব্যয় দেড়-দুই কোটি টাকা। সেখানে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা না থাকলেও সাত কোটি টাকা ব্যয় নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অর্থ নয়ছয় ও সরকারি অর্থ অচপয়ের আশঙ্কাও করছেন অনেকে।

জিইসি মোড়ের ফুটওভার ব্রিজটি প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ও ব্যয়বহুল ব্রিজ। চসিকের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১১ ডিসেম্বর এর দরপত্র সম্পন্ন হয়। নির্মাণের ঠিকাদারি পায় ঢাকার হাসান টেকনো এ আলিজাব্বা নামে প্রতিষ্ঠান। ডিপিএম নামে আরো একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও কাজ করছে এ প্রকল্পে। ২০২৪ সালের মার্চে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। বর্তমানে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, মূল নকশায় পরিবর্তন এনে ব্রিজটির সিঁড়ি ও চলাচল পথের প্রস্থ কমানো হয়েছে। শুরুতে একদিক থেকে অন্যদিকের একাধিক প্রান্তে সহজে যাতায়াতের সুবিধা রেখে এক্স বা এইচ আকৃতির নকশা করার পরিকল্পনা ছিল। মাঝখানে গোলাকার সংযোগস্থল রাখার কথাও ছিল। তবে সে সময় প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা আরশেদুল আলম বাচ্চু, কামাল স্টোর ও সেন্ট্রাল প্লাজার মালিকরা চসিকের কাজে বাধা দেন।

সরেজমিন দেখা যায়, ব্রিজটির চারপাশের সিঁড়ি, দুটি ডেক ও রেলিংয়ের কাজ প্রায় শেষ। সড়কের মাঝখানে নির্মিত আরসিসি পিলারের সামনে রয়েছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিশাল ওয়াই আকৃতির পিলার। তবে দুপাশের ব্রিজের সংযোগের কাজ তখনও সম্পন্ন হয়নি।

চসিকের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এইচ বা এক্স আকারের সুবিধা রেখে ব্রিজটি করার কথা থাকলেও পরে চসিকের প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীরা ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে ডিজাইন পরিবর্তন করে ফেলেন। এতে মার্কেটের মালিকরাও সুবিধা পেয়েছেন, কিন্তু ব্যবহারকারীদের জন্য এ ব্রিজ ব্যবহার জটিল হয়ে পড়বে। চার কোণায় চারটি পয়েন্ট নেওয়া হলেও ক্রস বা এইচ বাস্তবায়ন করা হয়নি। এতে পথচারীদের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে ঘুরপথ ব্যবহার করতে হতে পারে।

তারা আরো জানান, পরিবর্তিত ডিজাইনে ব্রিজের সিঁড়ি ও ডেকের প্রস্থ কমিয়ে আনা হয়েছে। সিড়ির প্রস্থ রাখা হয়েছে দেড় মিটার বা ৪.৯২ ফুট। আর মূল চলাচলের ডেকের প্রস্থ রাখা হয়েছে আড়াই মিটার বা ৮.২০ ফুট। যেখানে পূর্বের ডিজাইনে দুদিকের প্রস্থও দ্বিগুণ রাখা হয়েছিল।

প্রকল্পের উপপরিচালক প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম জানান, দুটি ব্রিজের মোট দৈর্ঘ্য ১৫০.৮ মিটার এবং প্রস্থ আড়াই মিটার। সিঁড়ির মোট দৈর্ঘ্য ৭৬.০৪ মিটার ও প্রস্থ দেড় মিটার। বিভিন্ন পক্ষের বাধার কারণে পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রিজটি বড় করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। আবার সড়কের ওপর সিঁড়ি নামালে রাস্তা সংকুচিত হয়ে যেত বলেও জানান এ কর্মকর্তা। নির্মাণকালে অনেকে হুমকি দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

চট্টগ্রাম নাগরিক নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা মাহি চৌধুরী বলেন, সাত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যথাযথ সুবিধা মিলবে কি না, সেটি সন্দেহ রয়েছে। ঠিকাদার ও প্রকৌশলীরা সিন্ডিকেট গড়ে তুলে এসব অর্থ লোপাট করছে। তারা মানুষের সুবিধা বা টেকসই উন্নয়নের কিছুই ভাবছে না।

ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি ও নগরবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, জিইসি ও লালখান বাজার মোড়ের ফুটওভার ব্রিজগুলো নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। মানুষের সুবিধার চেয়ে অবকাঠামো নির্মাণে অর্থ ব্যয়কেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার আশঙ্কা, ব্যবহার উপযোগী না হলে এসব ব্রিজ পরিত্যক্ত হয়ে অস্থায়ী দোকান ও ছিনতাইকারীদের আখড়ায় পরিণত হতে পারে।

এ বিষয়ে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান সোহেল জানান, ফুটওভার ব্রিজের ক্ষেত্রে ডিজাইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুসারে সর্বনিম্ন ১.২ মিটার প্রস্থ রাখতে হবে। আমরা দেড় মিটার রেখেছি। জমির সমস্যার কারণে সর্ব্বোচ্চ আকৃতি রাখা যায়নি। এছাড়া অন্য কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আমার দেশকে বলেন, ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড মেনেই ফুটওভার ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়েছে। এটি রাতে ঘুমানোর জন্য বা মালামাল বিক্রির জন্য করা হয়নি। চসিকের প্রকৌশলীরা অনেক ভেবেচিন্তে এগুলো নির্মাণ করেছেন। ড্রেন, ফুটপাত রক্ষা করে নির্মাণ করতে হয়েছে। এ বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। তারপরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে বিষয়টি আমি নিজে মনিটরিং করছি। এ প্রকল্পে কোনো অনিয়ম হবে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন