ক্লাসে যাওয়ার কথা বলে বের হয়েছিল হাসান, ফিরল লাশ হয়ে

উপজেলা প্রতিনিধি, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)

ক্লাসে যাওয়ার কথা বলে বের হয়েছিল হাসান, ফিরল লাশ হয়ে

সকালে প্রতিদিনের মতোই বই-খাতা গুছিয়ে ঘর থেকে বের হয়েছিল হাসান। গায়ে ছিল মাদ্রাসার পোশাক, হাতে ছিল ক্লাসের খাতা। মা ভেবেছিলেন ছেলে মাদ্রাসায় যাচ্ছে। বাবা হয়তো স্বপ্ন দেখছিলেন, একদিন এই সন্তানই পরিবারের কষ্ট দূর করবে। কিন্তু কেউ বুঝতে পারেননি, এটাই ছিল তাদের সঙ্গে হাসানের শেষ দেখা।

বন্ধুদের সাথে স্কুল পালিয়ে সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে গিয়ে প্রাণ হারাতে হলো এক কিশোর মাদ্রাসাছাত্রকে। বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ছোট কুমিরা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় হাসান ওরফে জিহাদ (১৫)। সে মিরসরাই উপজেলার বড় তাকিয়া এলাকার মো. নুরুদ্দিনের ছেলে এবং হাদী ফকিরহাট এলাকার মির্জা বাজার ইসলামী দাখিল মাদ্রাসার নবম শ্রেণির ছাত্র।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে প্রায় ১৫ জন স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী পরিবারকে না জানিয়েই ঘুরতে বের হয়। কারও গায়ে স্কুলড্রেস, কারও হাতে বই-খাতা ছিল। ক্লাসে যাওয়ার কথা বলে তারা একটি ট্রাকে করে সীতাকুণ্ডের কুমিরা আকিলপুর সৈকতের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। বন্ধুদের সাথে আনন্দ আর ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা থাকলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই আনন্দ পরিণত হয় শোকে।

নিহতের সহপাঠী শেখ মোহাম্মদ ওসমান জানায়, আমরা সবাই ট্রাকের বাম পাশ দিয়ে নেমেছিলাম। হাসান ডান পাশ দিয়ে নামতে গিয়ে হাত পিছলে নিচে পড়ে যায়। তখন পেছন থেকে আসা একটি গাড়ি তাকে চাপা দেয়। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ হয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার পর পুরো এলাকায় কান্নার পরিবেশ তৈরি হয়। সহপাঠীদের কেউ বন্ধুর মরদেহ জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল, কেউ আবার হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কিছুক্ষণ আগেও যে ছেলেটি বন্ধুদের সঙ্গে হাসছিল, তাকেই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে অনেকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন।

নিহতের এক আত্মীয় বলেন, সকালে বই হাতে বের হয়েছিল ছেলেটা। তার মা ভেবেছিল ক্লাসে গেছে। এখন সেই মা ছেলের রক্তমাখা পোশাক দেখে বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বেপরোয়া যান চলাচল ও অসচেতনতার কারণেই এ ধরনের দুর্ঘটনা বাড়ছে। তারা মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশকে নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানান।

সীতাকুণ্ড থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন জানান, এ ঘটনায় অজ্ঞাত গাড়িচালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বার আউলিয়া হাইওয়ে থানার ওসি আব্দুল হক বলেন, ঘাতক গাড়িটি শনাক্তের চেষ্টা চলছে। নিহতের চাচা মোহাম্মদ নুরুল হুদা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন।

এদিকে হাসানের মৃত্যুতে তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সহপাঠী ও পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহপাঠীদের অনেকেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিল, সকালে একসঙ্গে ঘুরতে বের হয়েছিলাম, সন্ধ্যায় তার জানাজায় দাঁড়াতে হবে, এটা কখনও ভাবিনি।

হাসানের মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার গল্প। সামান্য আনন্দের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ কত বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে, এই ঘটনাই তার নির্মম উদাহরণ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন