রাজশাহী অঞ্চলে আমের মৌসুম ঘিরে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। গাছভর্তি কাঁচা-পাকা আম, মোকামে শ্রমিকদের ব্যস্ততা, ট্রাকভর্তি চালান আর হাটবাজারের উৎসবমুখর পরিবেশে যেন উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন বার্তা দিচ্ছে। একসময় শুধু মৌসুমি ফল হিসেবে পরিচিত আম এখন রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর অঞ্চলের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে এই চার জেলায় প্রায় ১২ লাখ ৫৫ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আমকেন্দ্রিক পরিবহন, প্যাকেজিং, শ্রম, কুরিয়ার, ঝুড়ি শিল্প, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ব্যাংকিংসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মিলিয়ে লেনদেন ছাড়িয়ে যেতে পারে ১০ হাজার কোটি টাকা।
দেশের মোট আম উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই আসে রাজশাহী অঞ্চলের এই চার জেলা থেকে। গত দুই দশকে যেমন বেড়েছে বাগানের পরিমাণ, তেমনি বেড়েছে এর বাণিজ্যিক গুরুত্বও। উন্নত জাতের চাষ, আধুনিক বাগান ব্যবস্থাপনা ও অনুকূল আবহাওয়া আম উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কৃষিবিদদের মতে, বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবার রেকর্ড পরিমাণ আম উৎপাদন হতে পারে।
চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। এ জেলায় ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে চার লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. ইয়াছিন আলী বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাটি ও আবহাওয়া আম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানকার ফজলি, খিরসাপাত ও ল্যাংড়া আমের স্বাদ ও গুণগতমান দেশের অন্য জেলার তুলনায় আলাদা। শতবর্ষী ফজলি বাগানের ঐতিহ্যও রয়েছে এ জেলায়।
নওগাঁয় এবার ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগ আশা করছে, প্রায় তিন লাখ ৮৭ হাজার টন আম উৎপাদন হবে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, শুধু নওগাঁ জেলাতেই প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার আম-বাণিজ্য হতে পারে। জেলার উপপরিচালক হুমায়রা মণ্ডল জানান, গত বছর মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১০০ টন আম রপ্তানি হয়েছিল। এবার সেই লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ২০০ টন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, রপ্তানিযোগ্য ও রাসায়নিকমুক্ত আম উৎপাদনে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুসরণেও জোর দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহী জেলায় এ বছর ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় দুই লাখ ৪৪ হাজার টন। জেলার বাঘা উপজেলাতেই আট হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। সেখান থেকে এক লাখ তিন হাজার ২৯৬ টন আম উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। এছাড়া চারঘাট, পুঠিয়া, গোদাগাড়ী, মোহনপুর, বাগমারা ও দুর্গাপুরেও ব্যাপক আকারে আমের চাষ হয়েছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) পাপিয়া রহমান মৌরী জানান, অনুকূল আবহাওয়া থাকলে এবার প্রায় ৮০০ কোটি টাকার আম-বাণিজ্য হতে পারে। ইতোমধ্যে দেশি গুটি ও গোপালভোগ আম বাজারে উঠতে শুরু করেছে। পর্যায়ক্রমে খিরসাপাত, ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি ও আশ্বিনা বাজারে আসবে।
নাটোরেও আম অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। এ বছর পাঁচ হাজার ৬৯৩ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬৮ হাজার টন। কৃষি বিভাগ আশা করছে, এবার জেলার আম-বাণিজ্য ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। জেলা কৃষি কর্মকর্তা হাবিবুল ইসলাম খান বলেন, এবার ফলন ভালো হয়েছে। বাজারদর অনুকূলে থাকলে চাষিরা লাভবান হবেন।
আমকে ঘিরে এখন উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ। কৃষিবিদ আব্দুস সালাম জানান, গাছ থেকে আম নামানো, বাছাই, প্যাকেজিং, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ ও চালান কার্যক্রমে প্রায় তিন লাখ মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থান হয়। শ্রমিক, ট্রাকচালক, ভ্যানচালক, ঝুড়ির কারিগর, কুরিয়ার সার্ভিস, ব্যাংক, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ নানা খাতে অর্থনৈতিক গতি তৈরি হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট, রাজশাহীর বানেশ্বর, বাঘা, আড়ানী ও চারঘাট, নাটোরের লালপুর এবং নওগাঁর সাপাহার এখন দেশের অন্যতম বড় আম-বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন শত শত ট্রাকে আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, শুধু সাপাহার থেকেই প্রতিদিন তিন শতাধিক ট্রাকে আম চালান হচ্ছে।
রাজশাহীর বানেশ্বরের ব্যবসায়ী আমিনুল হোসেন বলেন, আম আমাদের টাকার ফল। এই কয়েক মাসের আয় দিয়েই অনেকের সারা বছরের সংসার চলে। একজন শ্রমিকও দিনে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।
পবা উপজেলার আমচাষি মনিরুল ইসলাম বলেন, মৌসুমের শুরুতে কিছু আম ঝরে গেলেও এখন ফলন ভালো আছে। দাম ভালো পেলে লাভ হবে। তানোরের চাষি জাকির হোসেন বলেন, রাজশাহীর আমের স্বাদ আলাদা। আশা করছি এবার ব্যবসা ভালো হবে।
রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আম এখন আর শুধু ঐতিহ্যের প্রতীক নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের বড় বাণিজ্যিক কৃষিপণ্য। তাদের মতে, রপ্তানি ও আমভিত্তিক কৃষিশিল্প গড়ে তোলা গেলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে।
তবে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদেশে আম পাঠাতে নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী উৎপাদন, সংগ্রহ ও প্যাকেজিং করতে হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প’ এ বিষয়ে চাষিদের সহায়তা করছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, ধান ও আলুর পর এখন আম উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিকল্পিতভাবে আমভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে পারলে সারা বছরই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
সবমিলিয়ে আম এখন শুধু একটি মৌসুমি ফল নয়, উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি। মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত কয়েক মাসের এই আমকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক চাঞ্চল্য বদলে দিচ্ছে হাজারো পরিবারের জীবন-জীবিকা। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, বড় ধরনের কালবৈশাখী না হলে চলতি মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ আম উৎপাদন ও বাণিজ্যের মাধ্যমে আরো চাঙা হবে আমের রাজধানীখ্যাত রাজশাহী অঞ্চলের অর্থনীতি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


জমে উঠছে কোরবানির পশুর হাট, খাদ্য-পরিবহনে বাড়তি খরচ