সন্দ্বীপের সাত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভবন সংকট

শামসুল আজম মুন্না, সন্দ্বীপ (চট্টগ্রাম)

সন্দ্বীপের সাত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভবন সংকট
ছবি: আমার দেশ

আর এর সরাসরি খেসারত দিচ্ছে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার সাতটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ভেঙে পড়েছে। নতুন ভবনের জন্য মাঠজুড়ে খোঁড়া হয়েছিল বিশাল গর্ত। কিন্তু কাজ শেষ না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উধাও হওয়ায়, সেই গর্ত এখন পরিণত হয়েছে বিপজ্জনক জলাশয়ে।

জানা গেছে, গত ছয় বছর ধরে নতুন ভবন না হওয়া, মাঠ ব্যবহারের অনুপযোগী থাকা এবং শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে এখানকার শিশুদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। টিনের একচালা ঘর কিংবা ফাটল ধরা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস করতে গিয়ে একদিকে যেমন ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান, অন্যদিকে আশঙ্কাজনক হারে কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ‘মাল্টিপারপাস ডিজাস্টার শেল্টার প্রজেক্ট’ (এমডিএসপি)-এর অধীনে ৩১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে এই ভবনগুলোর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। বর্তমানে প্রকল্পটির দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়েছে ‘দুর্যোগ প্রশমন ও টেকসই পুনরুদ্ধার’ বি-স্ট্রং প্রকল্পে।

এলজিইডি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৯ মার্চ ভবনগুলোর নির্মাণকাজের কার্যাদেশ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’। শর্তানুযায়ী ২০২৩ সালের ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি একটি ভবনের কাজও বুঝিয়ে দিতে পারেনি। নথিপত্র অনুযায়ী, দুটি ভবনের আট শতাংশ, দুটি ভবনের ১০ শতাংশ এবং বাকি তিনটির যথাক্রমে ১৫, ২৫ ও ৩০ শতাংশ কাজ হওয়ার পর ঠিকাদার কাজ বন্ধ করে দেয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার সন্তোষপুর ইউনিয়নের দ্বীপবন্ধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের জন্য মাঠের প্রায় অর্ধেক অংশ খনন করায়, তা এখন গভীর জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। পানির নিচে নিমজ্জিত রয়েছে আরসিসি খুঁটি। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের এক কোণে একটি একচালা টিনের ছোট স্থাপনার তিনটি কক্ষে গাদাগাদি করে চলছে ১১০ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোমেনা বেগম আমার দেশকে জানান, অস্থায়ী এই চালার নিচে ছয় বছর ধরে ক্লাস চলছে। মে মাসের তীব্র গরমে অনেক শিশু শ্রেণিকক্ষেই অচেতন হয়ে পড়েছিল।

একই চিত্র দেখা গেছে, কালাপানিয়া জগৎ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মুছাপুর তালুকদারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানেও একচালা টিনের ঘরে কোনোমতে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, মুছাপুর আবদুল্লাহ খুরশিদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন ভবন না হওয়ায়, ফাটল ধরা ও পলেস্তারা খসে পড়া পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই বাধ্য হয়ে ক্লাস করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এছাড়া মগধরা দারুস সালাম, দক্ষিণ-পশ্চিম চৌকাতলী ও মুছাপুর আজিজের রহমান বিদ্যালয়ে বিকল্প ভবন থাকলেও চারপাশের খোঁড়াখুঁড়ির কারণে মাঠগুলো সম্পূর্ণ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

শ্রেণিকক্ষের এই বেহাল দশা দেখে অভিভাবকরা সন্তানদের এসব বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে চাচ্ছেন না। কালাপানিয়া জগৎ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন আমার দেশকে জানান, পাঁচ বছর আগে তাদের বিদ্যালয়ে ৩৫০ জন শিক্ষার্থী ছিল, যা এখন কমে দাঁড়িয়েছে ১১৫ জনে। দ্বীপবন্ধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ২৫০ থেকে কমে ১১০ জনে নেমে এসেছে। একই চিত্র মুছাপুর তালুকদারপাড়া ও আবদুল্লাহ খুরশিদ স্কুলেও।

সন্দ্বীপ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহমুদুল হক আমার দেশকে জানান, করোনা মহামারির সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ গুটিয়ে নেওয়ার পর আর ফেরেনি। ওই কার্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। উপজেলা প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম আমার দেশকে জানান, শ্রেণিকক্ষ সংকটের অস্থায়ী সমাধানের জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য পাঁচ লাখ টাকা করে বরাদ্দের সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হলেও, কোনো সাড়া মেলেনি এখনো। আগের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে এবং ‘বি-স্ট্রং’ প্রকল্পের মাধ্যমে কাজের নতুন মূল্যায়ন হবে। তবে পুনরায় কবে কাজ শুরু হবে, তা তিনি সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি।

ঠিকাদারের রেখে যাওয়া গর্ত আর ধীরগতির আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সন্দ্বীপের উপকূলীয় প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা এখন চরম বিপর্যয়ের মুখে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বি-স্ট্রং প্রকল্পের পরিচালক হাসান আলী এবং এলজিইডির চট্টগ্রাম জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল মতিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশনের কর্মকর্তা আল আমিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এএস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...