সীতাকুণ্ড হাসপাতাল

আমার দেশে সংবাদ প্রকাশের পর বেড়েছে চিকিৎসাসেবার মান

জহিরুল ইসলাম, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)

আমার দেশে সংবাদ প্রকাশের পর বেড়েছে চিকিৎসাসেবার মান
ছবি: আমার দেশ

‘‘মৃত্যুফাঁদে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, সীতাকুণ্ডে ট্রমা সেন্টারের অভাবে ঝরছে প্রাণ’’ গত ৫ জুন আমার দেশে শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশের পর দ্রুত তৎপর হয়ে উঠেছেন হাসপাতাল প্রশাসন। আমার দেশের প্রতিবেদনটি দেখে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলতাফ হোসেনের নেতৃত্বে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে ধারাবাহিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে একটি আধুনিক, সুশৃঙ্খল, প্রযুক্তিনির্ভর ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রোগীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা, জরুরি বিভাগে দ্রুত চিকিৎসাসেবা প্রদান, ওয়ার্ড ও হাসপাতাল প্রাঙ্গণের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং দায়িত্বে অবহেলার ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে দেখা গেছে, বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও বিভিন্ন ওয়ার্ডে আগের তুলনায় অনেক বেশি শৃঙ্খলা ও কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। চিকিৎসাসেবা নিতে প্রতিদিন উপজেলার পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকা, শিল্পাঞ্চল, বিভিন্ন ইউনিয়ন এবং পার্শ্ববর্তী মিরসরাই উপজেলা থেকেও বিপুলসংখ্যক মানুষ হাসপাতালে আসছেন। বর্তমানে বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছেন।

রোগীর ক্রমবর্ধমান চাপ সামাল দিতে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। শিশুস্বাস্থ্য, মাতৃস্বাস্থ্য, ডেন্টাল ইউনিট, প্যাথলজি বিভাগ, জরুরি বিভাগ এবং বহির্বিভাগের কার্যক্রম আরও গতিশীল করা হয়েছে। রোগীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্যও প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হাসপাতালের পুরো এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলতাফ হোসেন নিজ কক্ষ থেকেই সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের মাধ্যমে হাসপাতালের বিভিন্ন ইউনিটের কার্যক্রম তদারকি করছেন। এতে শৃঙ্খলা ফিরেছে, কর্মীদের উপস্থিতি ও দায়িত্ববোধ বেড়েছে এবং রোগীদের সেবা নিশ্চিত করাও সহজ হয়েছে।

বিশেষ করে হাসপাতালের অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) কর্নারের ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অ্যাজমা ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এখানে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ, ওষুধ ও নিয়মিত ফলো-আপ সেবা পাচ্ছেন।

এদিকে কমিউনিটি ভিশন সেন্টারের মাধ্যমে দেশের বিশেষায়িত হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অনলাইনভিত্তিক পরামর্শসেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ৯০ জন রোগী এই সেবা গ্রহণ করছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীদের বিনামূল্যে চশমা ও চোখের ড্রপও সরবরাহ করা হচ্ছে।

মাতৃস্বাস্থ্য সেবায়ও এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশনের পরিবর্তে নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসবকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। দক্ষ মিডওয়াইফ ও গাইনি চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে ছয়টি স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হচ্ছে।

একই সঙ্গে সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম এবং জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন সার্বক্ষণিক বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। উপজেলার ২৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকও তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

এছাড়া হাসপাতাল প্রাঙ্গণে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। নিয়মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রোগীদের বসার স্থান গোছানো, নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং সেবাপ্রাপ্তি সহজ করতে বিভিন্ন তথ্যসেবা দৃশ্যমান করা হয়েছে। এতে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে।

তবে ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্যেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সীমিত শয্যাসংখ্যা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি, কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল সংকট এবং আধুনিক ট্রমা সেন্টারের অনুপস্থিতি এখনও বড় সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রমা সেন্টার স্থাপনের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।

এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলতাফ হোসেন আমার দেশকে বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ আমাদের আরও দায়িত্বশীল করেছে। আমরা চাই সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতাল থেকেই আধুনিক, আন্তরিক ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাক। সেবার এই ইতিবাচক ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দায়িত্বশীল গণমাধ্যম, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং মানবিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয় ঘটলে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। দ্রুত চিকিৎসকদের শূন্যপদ পূরণ, হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীতকরণ এবং একটি আধুনিক ট্রমা সেন্টার স্থাপন করা গেলে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চট্টগ্রাম বিভাগের অন্যতম মডেল সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।

এএস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...