বিভিন্ন স্থানে ধান ও চাল সংগ্রহে চলছে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি। এই দুর্নীতি বন্ধে চলছে অভিযান। অনিয়মের দায়ে দোষীদের শাস্তি হিসেবে জরিমানা করা হচ্ছে।
শ্রীবরদী (শেরপুর) প্রতিনিধি জানান, শেরপুরের শ্রীবরদীতে কৃষকদের কাছ থেকে ঢলন বা ধলতা প্রথায় ৪২ কেজি ধান নিয়ে ৪০ কেজির দাম দেওয়ার অভিযোগে দুই ধান ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
বুধবার বিকালে উপজেলার ভায়াডাঙ্গা বাজারে এ অভিযান পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনীষা আহমেদ।
অভিযান সূত্রে জানা যায়, উপজেলাতে দীর্ঘদিন ধরে কৃষকেরা বাজারে ধান বিক্রি করতে এলে ৪২ কেজি ধানে এক মণ হিসেবে মূল্য পরিশোধ করছিলেন। এতে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য ও পরিমাণ থেকে বঞ্চিত হয়ে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতেন।
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে নবিউল্লাহ ও খসরু মিয়া নামে দুই ব্যবসায়ীর প্রত্যেককে ৩ হাজার টাকা করে মোট ৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ সময় ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম থেকে বিরত থাকতে অন্য ব্যবসায়ীদেরও সতর্ক করা হয়।
অভিযানের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেন, অনেকদিন থেকে এই বাজারের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৪২ কেজিতে এক মণ ধান হিসেবে ক্রয় করার। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে আজকে ভায়াডাঙ্গা বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করে দুই ব্যবসায়ীকে জরিমানা করার পাশাপাশি ধান ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হয়। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি জানান, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহ-২০২৬ মৌসুমে অস্তিত্বহীন চাতাল ও মিল থেকে চাল সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ২৪ জন চাল ছাঁটাই মিল ও চাতাল মালিকের নামে চালের বরাদ্দ তালিকা প্রকাশ করেছেন। এতে দেখা যায়, অধিকাংশ চাল ছাঁটাই মিল ও চাতালের বর্তমানে কোনো অস্তিত্ব নেই।
তালিকা অনুযায়ী সরেজমিন দেখা যায়, অনেক চাতাল ও মিল ১০-১২ বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে কিন্তু এ তালিকায় তাদের নাম রয়েছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বন্ধ থাকা অধিকাংশ মিলের তালিকা প্রকাশ করায় চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, অস্তিত্বহীন চাতাল ও মিলের নামে চাল বরাদ্দ দিয়ে চাল সংগ্রহ করে চাল নিয়ে চালবাজি করেছে পাটগ্রাম উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়। তারা এটি সংশোধনের জোরালো দাবি জানান।
জানা গেছে, চাল সংগ্রহের চালকল নির্বাচনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ‘যেসব মিলে বয়লার ও চিমনি নেই, সেসব হাস্কিং মিলের সঙ্গে চাল সংগ্রহের জন্য চুক্তি করা যাবে না। প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয় হতে প্রাপ্ত সনদ থাকতে হবে। কোনো বন্ধ চালকল মালিকের সঙ্গে চুক্তি করা যাবে না। কিন্তু এসব নিয়মনীতির কিছুই অনুসরণ করেনি খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়।
আরো জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ বোরো মৌসুমে অর্থবছরে ২৪টি মিলারের কাছ থেকে প্রায় ৮৫৯ টন ও একটি আটো মিলের কাছ থেকে ৭৮০ টন সিদ্ধ চাল সংগ্রহের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে পাটগ্রাম উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়। তবে গত বছর ওই একটি অটো মিলের কাছ চাল সংগ্রহ করা হয়েছিল ৪৫৫ টন। এবার তার কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৭৮০ টন চাল। সাধারণ মিলারদের প্রশ্ন- কীভাবে অটো মিল এবার এত চাল দিচ্ছে। একটি অটো মিল চালু থাকলেও বাকি মিলের সিংহভাগই দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত বছর আমন সংগ্রহ মৌসুমে উপজেলা ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কেজিপ্রতি ৭৫ পয়সা উপরির বিনিময়ে অস্তিত্ববিহীন মিল ও চাতাল এ তালিকায় স্থান পেয়েছিল।
বোরো মৌসুমে অস্তিত্বহীন চাতাল ও মিলের নামে চাল বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নাসিম আল আকতার বলেন, ২৪টি মিলের মধ্যে কিছু ত্রুটি রয়েছে। মিল ও চাতালবিহীন ও অস্তিত্ববিহীন মিলের তালিকা হওয়ার সুযোগ কম। তবে অস্তিত্ববিহীন চাতাল মিলের নামের তালিকা থাকলে তা বাদ দেওয়া হবে।
মেসার্স শাকিরা চাল কলের মালিক শাহিনুর ইসলাম বলেন, আমার মিলের সবকিছুই রয়েছে, ধান কিনে নিজের মিলের মেশিন দিয়ে চাল উৎপাদন করলে খরচ বেশি হয়। তাই আমরা স্থানীয় ইনশাআল্লাহ অটো রাইস মিলে ধান দিয়ে সেখান থেকে চাল নিয়ে খাদ্যগুদামে দিচ্ছি।
পাটগ্রাম পৌরসভার বিশ্বজিৎ কুমার হিসাবিয়ার নামে দুটি পৃথক মিলের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার মিলের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। সরেজমিন দেখা যায়, তার মিলের কোনো অস্তিত্ব নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বজিৎ কুমার বলেন, ‘আমার মিলের একটি লাইন বিচ্ছিন্ন থাকলেও অপর মিলটি চালু আছে।
লালমনিরহাট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ডিসিএফ) কামরুজ্জামান মিয়া প্রকাশিত তালিকা সম্পর্কে বলেন, ‘এটা চলমান তালিকা। যাদের সক্ষমতা নেই, তদন্তের মাধ্যমে তাদের বাতিল করা হবে।’
নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, নবীগঞ্জে সরকারিভাবে প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহে উপজেলা খাদ্যগুদাম কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। এখানে সরকার দলীয় নেতাকর্মী ও সমন্বয়কদের প্রভাব বিস্তার করায়, সাধারণ কৃষকরা তাদের ধান নিজে দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। কৃষকের কার্ড বাধ্য হয়ে দিতে হচ্ছে ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির সিন্ডিকেট সদস্যদের হাতে। ফলে ওই কার্ড দিয়েই নেতারা গুদামে ঢুকাচ্ছেন ধান। আর কৃষকরা কার্ডের বিনিময়ে পাচ্ছেন নামমাত্র কিছু হাদিয়া।
সূত্রে জানা যায়, সারা দেশের ন্যায় নবীগঞ্জ উপজেলায় ১ হাজার ২৪০ টন ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। এখানে লটারির মাধ্যমে ৬১৫ জন কৃষকদের তালিকা অনুযায়ী ধান নেওয়ার কথা। কিন্তু কৃষকরা ধান নিয়ে গুদামে আসলেই সরকার দলীয় নেতাকর্মী ও সমন্বয়কদের ব্যারিকেট। গুদামে ধান দিতে গেলে তাদেরকে ম্যানেজ করে দিতে হয়। নতুবা সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপিসহ কয়েকজন সমন্বয়কদের নিয়ে ধান সংগ্রহ সংক্রান্ত একটি সিন্ডিকেট চক্র গড়ে উঠেছে। তারা গ্রামাঞ্চল থেকে কৃষি কার্ড সংগ্রহ করে দলীয় প্রভাব ও খাদ্যগুদাম কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে প্রায় ৩৪০ টন ধান ইতোমধ্যে খাদ্যগুদামে দিয়েছেন। এ কাজে জড়িত রয়েছে গুদাম কর্মচারী কাশেম মিয়া ও গুদাম সর্দার আব্বাছ মিয়া।
এছাড়া সরকারি নিয়মানুযায়ী ধানের আর্দ্রতা সঠিকভাবে পরিমাপ না করে ১৫, ১৬ ও ১৭% আর্দ্রতার ধান নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে কর্মকর্তা নীল রতন রায় বলেন, সরকারের নিয়ম অনুসরণ করেই ধান নেওয়া হচ্ছে। উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মজিদুর করিম মজিদ বলেন, দলীয় প্রভাব কাটিয়ে কেউ ধান সংগ্রহ অভিযানে বাধাগ্রস্ত করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় এমন কাজ বরদাস্ত করবে না বিএনপি। কৃষক গিয়াস উদ্দিন বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে জমির ধান গেল, সরকারি কৃষি প্রণোদনা থেকেও বঞ্চিত হলাম। যেটুকু ধান পেয়েছি, বাজার দর কম থাকায়, সরকারি গুদামে ধান দিতে গিয়েও সুযোগ পাইনি।
এএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

