আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন

খালেদা জিয়া প্রার্থী নাকি পরিবারের অন্য কেউ

প্রচারে এগিয়ে জামায়াতে ইসলামী

এস এম ইউসুফ আলী, ফেনী

খালেদা জিয়া প্রার্থী নাকি পরিবারের অন্য কেউ

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ফেনী-১ (ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী ও পরশুরাম) আসনে দলটির সম্ভাব্য প্রার্থী কে হচ্ছেনÑ দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নাকি অন্য কেউ, তা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনায় ঘুরপাক খাচ্ছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

অন্যদিকে, গত ১৬ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অনেক আগেই এই আসনে নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। পাশাপাশি দলীয় ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এখন পর্যন্ত প্রচারে এগিয়ে রয়েছে দলটি।

বিজ্ঞাপন

দলীয় অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলনও। তবে এখানে কোনো কমিটি নেই তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির।

এবারের পবিত্র ঈদুল আজহাকে ঘিরে ভোটারদের মন জয় করতে নানা কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত সময় পার করেছেন বিএনপি-জামায়াতসহ সম্ভাব্য সব প্রার্থী। ফলে অনেকটা সরগরম ছিল পুরো নির্বাচনি এলাকা।

দীর্ঘদিনের ভোটারবিহীন নির্বাচনের বাইরে এসে এবারের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও ভোটারদের ধারণা। নির্বাচনি আবহাওয়ায় উদযাপিত হয়েছে গেল পবিত্র ঈদুল আজহা।

নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ঈদ উদযাপনকে নির্বাচনি প্রস্তুতি হিসেবে নিয়ে চালিয়েছেন নানামুখী প্রচার। সম্ভাব্য প্রার্থীরা কর্মী-সমর্থকদের চাঙা করতে ছুটে যান নির্বাচনি এলাকার হাটবাজারে। পাশাপাশি এলাকার সাধারণ মানুষকে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।

ঈদের আগে থেকে এবং ছুটিকে কাজে লাগিয়ে তারা এলাকাবাসীর পাশে থাকারও চেষ্টা করেছেন। শুভেচ্ছা বিনিময়ের নামে এলাকায় চালিয়েছেন প্রচার ও গণসংযোগ। ব্যানার-পোস্টারে ছেয়ে গেছে অধিকাংশ এলাকা। এতে ঈদের পাশাপাশি ভোটের আমেজও সৃষ্টি হয়েছে।

এসব রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রত্যেকেই আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনসাধারণের কাছে সহযোগিতা চাওয়া শুরু করেছেন। তারা মতবিনিময় সভা এবং নানা ধরনের সেমিনার, গণসংযোগ, উঠান বৈঠকে অংশ নিয়েছেন।

এরই মধ্যে অনেকে কৌশলে নিজের প্রার্থিতার বিষয়টিও ঘোষণা করেছেন। ঈদের পর নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঈদ পুনর্মিলনী, বৃক্ষরোপণ, ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় পুরস্কার বিতরণসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেখা গেছে।

একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের নেতাকর্মীর পরিবারের পাশেও দাঁড়িয়েছেন কেউ কেউ। এসএমএস পাঠিয়ে এবং সোশ্যাল মিডিয়া, ব্যানার-পোস্টারের মাধ্যমে গণসংযোগ করেছেন সম্ভাব্য প্রার্থী ও তাদের সমর্থনকারী নেতারা। সব মিলিয়ে ঈদ আনন্দের সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের আমেজে চাঙা হয়ে ওঠে প্রতিটি এলাকা।

পৈতৃক এলাকার এ আসনটি থেকে বিজয়ী হয়ে এরই মধ্যে তিনবার প্রধানমন্ত্রী এবং দুবার বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন খালেদা জিয়া।

দেশের জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ভৌগোলিক অবস্থান এবং নানা কারণে জেলার সীমান্তবর্তী তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত ফেনী-১ আসনটি জাতীয় সংসদে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

১৯৭৩ সালের পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এ আসনে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারেননি। বিগত ২০০৮ সালের নির্বাচনেও নৌকার প্রার্থী ফাইজ আহমেদ খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে পরাজিত হন।

এরপর ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোট থেকে জাসদের শিরীন আখতার বিনা ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। যদিও স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে এ অঞ্চল থেকে নির্বাচিত হন প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুস সালাম, অবিভক্ত বাংলার প্রথম নারী মুসলিম গ্র্যাজুয়েট বেগম সামছুন্নাহার, হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরীর মতো খ্যাতিমান বাঘা বাঘা ব্যক্তি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এ আসন থেকে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে সর্বপ্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন খ্যাতিমান সাংবাদিক এবিএম মূসা। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮-র নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে জাফর ইমাম বীরবিক্রম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

পরে তিনি একই আসনে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে লাঙ্গল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে তিনি একই আসনে খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান।

ফেনী-১ আসনে ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাকারিয়া ভূঞাকে পরাজিত করে খালেদা জিয়া সর্বপ্রথম বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এম ওয়াজী উল্লাহ ভূঞাকে পরাজিত করে দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং ১৯৯৬ সালের পুনর্নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন খালেদা জিয়া।

২০০১ সালের নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাফর ইমামকে পরাজিত করে তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান খালেদা জিয়া।

পরবর্তী সময়ে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালে এ আসনে ১৪ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে প্রথমবার বিনাভোটে ও ২০১৮ সালে দ্বিতীয়বার বিএনপি প্রার্থী রফিকুল আলম মজনুকে মধ্যরাতে জালিয়াতির মাধ্যমে পরাজিত করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার দ্বিতীয় মেয়াদে সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত ছাড়াই ভোটারবিহীন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের আলাউদ্দিন নাসিম সংসদ সদস্য হয়েও ছয় মাস না পেরুতেই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবার এই আসনটিতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকেই প্রার্থী চান দলটির তৃণমূল নেতাকর্মী ও স্থানীয়রা।

তবে শারীরিক কারণে তিনি নির্বাচন করতে অক্ষম হলে এখানে দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে বেগম জিয়ার ছোট ছেলে মরহুম কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান, বিএনপির কেন্দ্রীয় গ্রাম সরকারবিষয়ক সম্পাদক বেলাল আহমেদ ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ এবং প্রয়াত সাঈদ ইস্কান্দারের ছেলে ব্যারিস্টার শামস ইস্কান্দারের নামও শোনা যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু আমার দেশকে বলেন, বেগম জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশে ২০১৮ সালে বিশেষ পরিস্থিতিতে ফেনী-১ আসন থেকে তিনি নির্বাচন করেন। এবার যদি ম্যাডাম খালেদা জিয়া নির্বাচন না করেন, তাহলে তিনি সেখান থেকে নির্বাচন করতে চান।

এদিকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এ আসনটিতে একক প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য অ্যাডভোকেট কালাম আহমেদ দলীয় প্রার্থী হিসেবে নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে স্থানীয়দের মন জয় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (মামুনুল হক), জেলা সভাপতি মাওলানা নাজমুল আলম এবং খেলাফত মজলিসের জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক মাওলানা আবদুল আজিজ আহমদীকে নিজ নিজ দলের একক প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকেও দলটির জেলা কমিটির উপদেষ্টা ফরিদ উদ্দিন আল মোবারককেও দলটির পক্ষ থেকে প্রার্থী ঘোষণা দেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।

তবে এ আসনে এখন পর্যন্ত কমিটি ঘোষণা করতে পারেনি এনসিপি। ফলে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন এ নতুন দলটিসহ গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা।

এছাড়া হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী জেলার এ আসনটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭২ হাজার ৭৬১ জন রয়েছে বলে জানা গেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন