কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বড়াইবাড়ি সীমান্তে তৎকালীন বিডিআর ও বিএসএফের মধ্যে সংঘর্ষের ২৫তম বার্ষিকী আগামীকাল। ২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ বড়াইবাড়ি গ্রামে ঢুকে নারকীয় তাণ্ডব চালায়। ভোর পাঁচটা থেকে তীব্র গোলাগুলির আওয়াজে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে বড়াইবাড়ি গ্রাম ও তার আশপাশের গ্রাম। আত্ম রক্ষার্থে গ্রামবাসী তাদের বাড়িঘর ফেলে আশ্রয় নিয়েছিল অন্যত্র।
ওই দিন বিএসএফ-বিজিবির মাঝে প্রায় ৪২ ঘণ্টার সম্মুখযুদ্ধে বিএসএফ’র মর্টার সেল ও আগুনের তাণ্ডবে লন্ডভন্ড হয়েছিল ভারত লাগোয়া গ্রামের বড়াইবাড়িসহ ছিটমলের ১৭৯টি বাড়ি। নিহত হন বাংলাদেশের তিন বিডিআর সদস্য ও গুলিবিদ্ধে আহত হয় ৬ বাংলাদেশি সাধারণ মানুষ ।
ভারতীয় পক্ষে নিহত হয় ১৬ বিএসএফ সদস্য ও দুজন জীবিত বিএসএফ সদস্যকে আটক করেছিল এলাকাবাসী। সেই থেকে বড়াইবাড়ি গ্রামবাসী ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে এই দিনটি ‘বড়াইবাড়ি দিবস’ হিসেবে পালিত হলেও ২৫ বছরেও বীর গ্রাম বা বড়াইবাড়ি দিবসের কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি এখনও।
ওই সময়টা ছিল ইরি মৌসুম। প্রত্যহিক কাজের তালিকা মতে বড়াইবাড়ি গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা তাদের কৃষিজমিতে সেচ কাজে নিয়োজিত ছিলেন ভোর রাতে। হটাৎ দেখতে পান তাদের ইরি ধানক্ষেতে ভারতীয় বিএসএফ অস্ত্র নিয়ে ঘুরাফেরা করছে। এলকাবাসীর একজন সাইফুল ইসলাম লাল মিয়া এগিয়ে গেলে বিএসএফরা তাকে হিন্দি ভাষায় জিজ্ঞেস করে বিডিআর ক্যাম্প কোথায়?
সাইফুল ইসলাম লাল মিয়া বিষয়টি বুঝতে পেরে বড়াইবাড়ি বিডিআর ক্যাম্পে খবর দেন। তখন বিডিআর ক্যাম্পে মাত্র আটজন বিডিআর সদস্য ছিলেন। সেই সময়ের স্থানীয় সাংসদ (কুড়িগ্রাম-৪) রুহুল আমিন ওই এলাকার হওয়াতে তিনিও খবর পেলেন। নিজে ছুটে এলেন ও স্থানীয় মানুষজনকে সংগঠিত করে বিডিআরের হাত শক্ত করতে সহায়তা করেন। আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাইফুল ইসলাম লাল মিয়াসহ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১২ জন সদস্যকে একত্রিত করেন রুহুল আমিন।
সাইফুল ইসলাম লাল বলেন, ‘আমি আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে আমিও তখন অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলাম।’
বড়াইবাড়ি বিডিআর ক্যাম্পের আটজন সদস্য প্রচণ্ড মনোবল এবং সাহস নিয়ে প্রথম চার ঘন্টা লড়াই চালিয়ে গেছেন। এরই মধ্যে আশপাশের আরো দুটি বিডিআর ক্যাম্প থেকে প্রায় ২০ জন সদস্য বড়াইবাড়িতে যোগ দিয়েছিল। এরপর বড়াইবাড়িতে যখন তীব্র সংঘর্ষ চলছে তখন ঢাকায় তৎকালীন বিডিআর (এখন বিজিবি) সদরদপ্তরের নির্দেশনায় জামালপুর এবং ময়মনসিংহ থেকে আরো বিডিআর সদস্য পাঠানো হয়েছিল বড়াইবাড়িতে।
সাবেক সংসদ সদস্য রুহুল আমিন বলেন, ওই দিন ভোর পাঁচটা থেকে সকাল এগারোটা পর্যন্ত বড়াইবাড়ি গ্রাম ছিল আতঙ্কজনক বা ভীতিকর পরিস্থিতির নাম, দুপক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়। এরপর কিছুক্ষণ বিরতির ১৮ এপ্রিল সারা দিন এবং রাত গড়িয়ে ১৯ এপ্রিল রাত পর্যন্ত থেমে থেমে গোলাগুলি চলে।
স্থানীয় বাসিন্দা এবং তৎকালীন বিডিআর সদস্যদের দাবি ছিল, সে ঘটনায় বিএসএফ'র আরো বেশি সৈন্য মারা গেলেও অনেকের লাশ তারা ভারতে নিয়ে গেছে। মাত্র ১৬ জন সৈন্যের লাশ নিতে পারেনি সেগুলো বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে ধানক্ষেতে পাওয়া গিয়েছিল। পরে তা ভারতকে ফেরত দেওয়া হয়েছিল।
সম্মুখযুদ্ধে বিজিবির সদস্য নায়েক সুবেদার ওয়াহিদ মিয়া, সিপাহি মাহফুজার রহমান ও সিপাহি আব্দুল কাদের শহীদ হন । শহীদ তিনজনের স্মরণে ক্যাম্পের সামনে একটি স্মৃতিস্তম্ভনির্মাণ করা হয়েছে। প্রতি বছর ওই এলাকার স্থানীয় লোকজন ও প্রশাসনের সহায়তায় বড়াই বাড়ি দিবস হিসেবে পালন করে আসছে ২৫ বছর ধরে। সেই সঙ্গে বড়াইবাড়ি এলাকার মানুষের দাবি বড়াইবাড়ি গ্রামকে বীরগ্রাম ও বড়াই বাড়ি দিবসকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হোক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

