চট্টগ্রাম নগরীর দুই নম্বর গেটে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বিপ্লব উদ্যান। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালে এখান থেকে ‘উই রিভোল্ট’-এর (বিদ্রোহ) ঘোষণা দিয়েছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন তিনি।
পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে সেখানে বিপ্লব উদ্যান গড়ে তোলা হয়। উদ্যানের ফলকে বিএনপি প্রতিষ্ঠাতার নাম থাকাই যেন কাল হয়ে দাঁড়ায়। চসিকের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির ও রেজাউল করিম ইতিহাসকে মুছে ফেলতে সেখানে বাণিজ্যিক ভবন করার উদ্যোগ নেন। দফায় দফায় লিজ দিয়ে ভাড়া দেওয়া হয় দোকান ।
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী নগরবাসী এটিকে নিয়ে নতুন আশা দেখতে শুরু করলেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসনও একই পথে হেঁটেছে। সম্প্রতি একটি প্রতিষ্ঠানকে ২৫ বছরের জন্য ইজারা দিয়ে সেখানে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে চসিক। এতে ঐতিহাসিক উদ্যানটি আবারও হুমকির মুখে পড়ে। সবুজ উদ্যানটিকে ইট-সুরকির জঞ্জালে রূপ দেন ইজারাদাররা ।
চসিকের রাজস্ব বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত জুনে নূর প্রপার্টিজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২৫ বছরের জন্য চুক্তি করেছে চসিক। এতে সেখানে একতলা থেকে বর্ধিত করে চারতলা পর্যন্ত ভবন তোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যদিও মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছিলেন, বিপ্লব উদ্যানে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক ভবন করা হবে না। এমনকি আগের মেয়রের করা বাণিজ্যিক ভবন ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। ছয় মাস পর সাবেক মেয়রদেরকেই অনুসরণ করল বর্তমান চসিক প্রশাসন।
এদিকে বিপ্লব উদ্যান নিয়ে আবারও মুখোমুখি হয়েছে সিটি করপোরেশন ও নাগরিক সমাজ। বেলা ও পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামসহ বিভিন্ন সংগঠন ইতোমধ্যে চিঠি দিয়েছে চসিক মেয়রকে। তাছাড়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও বলছে, সবুজ বিপ্লব উদ্যানে নতুন করে কোনো ভবন নির্মাণের সুযোগ নেই। একইসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদরাও এর সমালোচনা করছেন।
সিডিএ সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত বিপ্লব উদ্যানে নূর প্রপার্টিজের নামে নতুন ভবনের কোনো প্ল্যান অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়নি।
তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে আগের ইজারাদার থেকে তেমন কোনো রাজস্ব না আসায় এবং উদ্যানটি অরক্ষিক্ত থাকায় চসিক এই উদ্যোগ নেয়।
তথ্যমতে, ১৯৭৯ সালে এক একর জমিতে বিপ্লব উদ্যান গড়ে তোলা হয়। গত সাত বছরে তিনজন মেয়র তাদের কার্যকালে বিপ্লব উদ্যানের সৌন্দর্য বর্ধন ও উন্নয়নের অজুহাতে তিনটি চুক্তি করেছেন। এর মধ্য দিয়ে ইট-পাথরের আঘাতে বারবার জর্জরিত হয়েছে এই উদ্যান।
মেয়রকে দুই সংগঠনের চিঠি
বিপ্লব উদ্যানে বাণিজ্যিক ভবন গড়ে না তুলতে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরাম ও বাংলাদশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। গত ১৪ আগস্ট বেলা চসিক মেয়র, সিডিএ, সিএমপি কমিশনার, নূর প্রপার্টিজসহ সরকারের তিন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে এই চিঠি পাঠানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, শিশুদের খেলাধুলা ও বয়োবৃদ্ধদের জন্য অবসরযাপনের এই স্থানটি নগরবাসীর কাছে অক্সিজেন ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সিটি করপোরেশন সৌন্দর্যবর্ধনের নামে দফায় দফায় কৌশলে এই উদ্যানের সবুজায়ন ধ্বংস করা হয়েছে। একইভাবে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামও চিঠি দিয়েছে চসিক মেয়রকে।
এ বিষয়ে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের জয়েন্ট সেক্রেটারি তাসলিমা মুনা জানান, এর আগের মেয়রদেরও আমাদের এই চিঠি দিতে হয়েছে। বর্তমান মেয়রকেও দিতে হলো। তারা বারবার বলেন, আমরা এমন কাজ করব না। কিন্তু সেটাই তারা করেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। শহরে আর কোনো মাটি থাকছে না। এতে শব্দদূষণ, পরিবেশ ধ্বংস, জলাবদ্ধতাসহ অপরিকল্পিত শহরের ষোলকলা পূর্ণ হচ্ছে।
বেলার চট্টগ্রামের সমন্বয়ক মুনীরা পারভীন জানান, শহরে একটু স্বস্তিতে নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা এই উদ্যান। এর প্রয়োজনীতা অনেক ও অপরিহার্য। কিন্তু উন্নয়নের নামে বারবার সিটি করপোরেশনের নজর এসব খোলা জায়গায় পড়ছে। যেন এগুলোকে ভেঙেচুরে না দিলে উন্নয়ন সম্ভবই নয়। এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে না এলে আমরা আইনি ব্যবস্থা নেব।
নূর প্রপার্টিজের ম্যানেজার তুষার দে এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তবে তিনি জানিয়েছেন, তারা শিগগির উদ্যানে কাজ শুরু করবেন।
চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম জানান, রাজস্ব আয়ের কথা চিন্তা করে এটি করা হয়েছে। আমরা বেলা থেকে নোটিস পেয়েছি। বিভিন্ন মহল এটির বিরোধিতা করছে। এখন বিষয়টি বিবেচনা করছি। এ বিষয়ে মেয়র সিদ্ধান্ত দেবেন।
চসিকের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাধার মুখে চসিক এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারে। তবে এখনো অফিসিয়ালি ওই চুক্তি কার্যকর আছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম জানান, আমি মনে করি এ ধরনের উদ্যানে বাণিজ্যিক স্থাপনা না করাই ভালো। আমাদের কাছে ভবনের নকশা অনুমোদনের কোনো আবেদন জমা হয়নি। আমরা আমাদের মতামত তুলে ধরব।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

