বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ–মুলাদী) সংসদীয় আসনকে ঘিরে নির্বাচনি উত্তাপ এখন তুঙ্গে। জেলার গুরুত্বপূর্ণ দুই উপজেলা বাবুগঞ্জ ও মুলাদী নিয়ে গঠিত এ আসনটি বরাবরই বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে। ভৌগোলিক ও যোগাযোগগত দিক থেকেও বাবুগঞ্জ বরিশালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা। রাজধানী থেকে সড়কপথে বরিশালে প্রবেশের প্রধান প্রবেশদ্বার এ উপজেলার ওপর দিয়েই। পাশাপাশি আকাশপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও বাবুগঞ্জ কার্যত বরিশালের একমাত্র প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। এসব কারণেই বরিশাল-৩ আসনকে ঘিরে রাজনৈতিক আগ্রহ সবসময়ই তুঙ্গে থাকে।
আগের নির্বাচনগুলোতে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ কখনো এ আসনে এককভাবে জয় লাভ করতে পারেনি। তবে দলটির শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা শেখ টিপু সুলতান একবার এবং জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু তিনবার এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে সাবেক এমপি জাতীয় পার্টি গোলাম কিবরিয়া টিপু কারাগারে থাকার ফলে এ প্রার্থীকে রাজনীতিতে বাড়তি আলোচনা ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। কেননা তার পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন তার মেয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হাবিবা কিবরিয়া। অন্যদিকে, বিএনপির ‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত বরিশাল-৩ আসনে এবার দলটির হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদিন। দীর্ঘদিন ধরে এ আসনে বিএনপির শক্ত ভোটব্যাংক থাকলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রার্থী জট দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও দলীয় প্রতীক ধানের শীষের প্রতি ভোটারদের আস্থা এবং জয়নুল আবেদিনের ব্যক্তিগত ইমেজকে পুঁজি করে আসনটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ কার্যত মাঠের বাইরে থাকায় এ আসনে মূল লড়াই গড়ে উঠেছে বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং ১১ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির মধ্যে। তিন পক্ষেরই নিজস্ব শক্ত অবস্থান থাকায় কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ, ফলে ভোটের সমীকরণ দিন দিন আরো জটিল হয়ে উঠছে।
জাতীয় পার্টি এ আসনে কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। তিনবারের সাবেক এমপি গোলাম কিবরিয়া টিপুকে কেন্দ্র করে দলটি মহাজোটের ভোটারদের পাশাপাশি নারী ভোটার ও আ. লীগের একটি অংশের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে মাঠ গোছানোর কাজ প্রায় শেষ করেছে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি। দলটির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বাবুগঞ্জ ও মুলাদীজুড়ে ধারাবাহিক গণসংযোগ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হওয়ায় বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠিত কর্মী বাহিনী ব্যারিস্টার ফুয়াদের বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা অন্য দুই প্রার্থীর জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোট যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তবে এ আসনে জয়-পরাজয়ের চাবিকাঠি থাকবে সাধারণ ও নিরপেক্ষ ভোটারদের হাতে। দলীয় হিসাবের বাইরে গিয়ে এ ভোটারদের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করবে।
সব মিলিয়ে বরিশাল-৩ আসনে রাজনীতির মাঠ এখন ভোটের গাণিতিক হিসাব মেলানোর অপেক্ষায়। বিএনপির ঐক্য ধরে রাখার সক্ষমতা, জাতীয় পার্টির নীরব ভোটব্যাংক এবং এবি পার্টির জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীর সংগঠিত কর্মী শক্তি—এ তিনটি ফ্যাক্টরই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এক টানটান উত্তেজনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

