‘আমার ছেলে হৃদয় চন্দ্র তরুয়া ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট করে বড় হয়েছে। অনেক চেষ্টা ও সংগ্রাম করে লেখাপড়া করেছে। আমাদের নিজের ঘরবাড়ি নেই। আমি কাঠমিস্ত্রির কাজ করি। আর ওর মা অন্যের বাসাবাড়িতে কাজ করত। এসব কষ্ট দেখেই ও বড় হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই ওর মনে একধরনের জেদ ছিল—তাকে মানুষ হতে হবে। এখন ওর কথা ভাবলেই বুকের মধ্যে হাহাকার করে ওঠে।’
কথাগুলো বলতে বলতে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিলেন রতন তরুয়া। তিনি পটুয়াখালী সদর উপজেলার চরপাড়া নতুন বাজার গ্রামের বাসিন্দা। স্ত্রী অর্চনা রাণী, বড় মেয়ে মিতু এবং একমাত্র ছেলে হৃদয় চন্দ্র তরুয়াকে নিয়ে ছিল তার ছোট্ট সংসার। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সেই সংসারে নেমে আসে এক অপূরণীয় শোক। ২৩ জুলাই সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হৃদয়। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে রতন তরুয়ার সেই ছোট্ট সংসার যেন মুহূর্তেই শূন্য হয়ে যায়। আজও ছেলেকে মনে পড়লেই বুকভরা হাহাকার আর স্মৃতিই তাদের একমাত্র সঙ্গী।
হৃদয় চন্দ্র তরুয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। স্বপ্ন ছিল বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশের সেবা করার। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে তিনি নিয়মিত পড়াশোনা করতেন। তবে নিজের অধিকার আদায়ের প্রত্যয়ে তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোটা সংস্কার আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, ষোলশহর রেলস্টেশন, ২ নম্বর গেটসহ বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত আন্দোলনে তিনি অংশ নিয়েছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট চার রাস্তার মোড়ে আন্দোলনে যোগ দেন তিনি। সেদিন দুপুর আড়াইটার দিকে আন্দোলন চলাকালে তিনি বুকে গুলিবিদ্ধ হন।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তার সহপাঠীরা দ্রুত তাকে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় পরে ঢাকায় রেফার করা হলে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর তাকে জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সর্বশেষ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৩ জুলাই সকালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার বাবা রতন তরুয়া আমার দেশকে বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর যারা হৃদয়কে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল, তারা প্রথমে আমার মেয়ে মিতুকে ফোন করেছিল। তবে ওকে বিস্তারিত কিছু বলেনি। শুধু জানিয়েছিল, হৃদয়ের রাবার বুলেট লেগেছে। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে, আপনারা চিন্তা করবেন না, সে সুস্থ হয়ে যাবে।
একমাত্র সন্তানকে হারানোর বেদনা প্রকাশ করতে গিয়ে রতন তরুয়া বলেন, যে তার একমাত্র ছেলেকে হারিয়েছে, সেই-ই এই কষ্ট বুঝবে। আমি কী হারিয়েছি, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো ক্ষমতা আমার নেই।
সরকার থেকে দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকার থেকে যা দিয়েছে, তা পেয়েছি। আমরা গ্রামের সাধারণ মানুষ। ডিসি-এসপিরা যা বুঝিয়েছেন, সেটাই বুঝেছি। এসব নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করার শক্তি আমার নেই। এখন একটি ভাতা চালু হয়েছে, সেটা পাচ্ছি।
রাজনৈতিক দলগুলোর পাশে দাঁড়ানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের পাশে জুলাই ফাউন্ডেশন দাঁড়িয়েছে। জামায়াতে ইসলামী শুরু থেকেই বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছে। এখনো কোথাও কোনো অনুষ্ঠান হলে তারা আমাদের আমন্ত্রণ জানায়। আর বিএনপি সরকার গঠনের পর আগের তুলনায় সহযোগিতা কিছুটা কমে গেছে। পটুয়াখালী-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী নির্বাচনের পর আর খোঁজ নেননি।
তিনি বলেন, এনসিপির নাহিদ ইসলাম ও সারজিস আলম একবার পটুয়াখালী এসেছিলেন। আমাদের বাড়িতেও আসার কথা ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর আসেননি। এখন আমাদের বাড়িতে সবার যাতায়াতই আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও থানায় হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার হত্যা মামলাটি দায়ের করা হয়। নগরের চন্দনাইশ উপজেলার বৈলতলী গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আজিজুল হক নিজেকে হৃদয়ের বন্ধু পরিচয় দিয়ে মামলাটি করেন। মামলায় পতিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২০৬ জনকে আসামি করা হয়। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এদিকে মামলাটি ঘিরে মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ তুলেছেন হৃদয়ের বাবা রতন তরুয়া এবং তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এ ছাড়া প্রায় দুই বছর পার হতে চললেও এখনো শেষ হয়নি মামলার তদন্ত কার্যক্রম।
এ বিষয়ে রতন তরুয়া আমার দেশকে বলেন, মামলার বিষয়টি আমার আয়ত্তের বাইরে। চট্টগ্রামের এক ব্যক্তি, আজিজুল হক নিজেকে আমার ছেলের বন্ধু পরিচয় দিয়ে মামলা করেছেন। আমার মনে হয়, তিনি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এটি করেছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা লিটন আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। তিনি বলেছেন, কিছু লোক এই মামলাকে কেন্দ্র করে মানুষকে জিম্মি করে টাকা আদায়ের চেষ্টা করছে। আমার সন্তানকে কে হত্যা করেছে, তা আমি জানি না। তবে আমি চাই, আমার সন্তানের হত্যার সঠিক বিচার হোক।
হৃদয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মো. হারুন বলেন, যিনি বন্ধু পরিচয়ে মামলা করেছেন, তার সঙ্গে আমরা বহুবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। তিনি বারবার সময় দিলেও শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে দেখা করেননি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার বাদী মোহাম্মদ আজিজুল হক আমার দেশকে বলেন, আমি মামলা বাণিজ্য করেছি—এমন কোনো প্রমাণ কারও কাছে নেই। হৃদয়ের বাবার অনুমতি নিয়েই দায়বদ্ধতা থেকে আমি মামলাটি করেছি। কিন্তু মামলা করার পর থেকে আমি নানা চাপ ও বিতর্কের মুখে পড়েছি। এখন না পারছি মামলা প্রত্যাহার করতে, না পারছি এটি স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করতে।
চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জসীমউদ্দিন বলেন, মামলার তদন্ত এখনো চলমান। মামলা বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

