ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর পুরো দেশ যখন বিভিন্ন মেরূকরণে বিভক্ত, ঠিক সেই সময় রাজশাহী যেন দেখাল রাজনীতির এক ভিন্ন দৃষ্টান্ত। জয়ের উল্লাস আর পরাজয়ের গ্লানি সবকিছুকে ছাপিয়ে গেল সৌহার্দ ও সম্প্রীতির বন্ধন। রাজশাহীর ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপি ও দুটিতে জামায়াতের প্রার্থীরা জয়লাভ করলেও হার-জিতের কোনো তিক্ততা ছড়ায়নি। বরং, বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীরা একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রাজশাহীর সার্বিক উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে এ সম্প্রীতির সুবাতাস ইতিবাচক বার্তা হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে।
নির্বাচন-পরবর্তী রাজশাহীর রাজনৈতিক অঙ্গনের উষ্ণতার ছোঁয়া লাগে শনিবার থেকে। রাজশাহী মহানগর জামায়াতের নেতারা সদর আসনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান মিনুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানোর পর এক অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময়ে মিলিত হন তারা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির আবু মোহাম্মদ সেলিম, সেক্রেটারি এমাজ উদ্দিন মন্ডল, সাংগঠনিক সম্পাদক জসিম উদ্দিন প্রমুখ।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আসনের সার্বিক উন্নয়ন, বিশেষ করে শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নদীভাঙন রোধ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
এদিকে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে রাজশাহী-৩ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনের ঘটনা। নির্বাচনি উত্তাপ কাটিয়ে বিজয়ী ও পরাজিত দুই প্রার্থী গণতান্ত্রিক চেতনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিএনপি মনোনীত বিজয়ী প্রার্থী শফিকুল হক মিলন। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদের নিজ বাসভবনে দেখা করতে গেলে সেখানে একে অপরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং সৌহার্দপূর্ণ আয়োজনে উভয় নেতা একে অপরকে মিষ্টি খাইয়ে দেন। কিছুদিন আগেও যারা ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, তাদের মধ্যে দেখা গেল আত্মীয়তার বন্ধন।
এ সময় জামায়াত নেতা আবুল কালাম বলেন, দীর্ঘদিন আমরা একসঙ্গে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলাম। নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবেই। তিনি জনগণের রায়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাই রাজশাহী-৩ আসনের উন্নয়নে আমি সর্বাত্মক সহযোগিতা করব, ইনশাআল্লাহ।
এ সময় বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মিলন আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলেন, নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব। মতপার্থক্য থাকলেও আমাদের লক্ষ্য এক, জনগণের কল্যাণ। আজাদ ভাইয়ের মতো একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তির দোয়া ও সহযোগিতা পেলে আমি রাজশাহী-৩ আসনের উন্নয়নে দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে কাজ করতে পারব।
রাজশাহী-৫ (দুর্গাপুর-পুঠিয়া) আসনে নির্বাচিত বিএনপির নজরুল ইসলাম মন্ডলকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতা মনজুর রহমান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন নির্বাচন মনিটরিং কমিটির প্রধান মুহাম্মদ নুরুজ্জামান লিটন।
অন্যদিকে, রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসন থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ। নির্বাচনের পরদিন সকাল থেকে তার বাসভবনে ছিল আনন্দ-উৎসবের আমেজ। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ভিড় ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করেন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ নাজমুল হক। উপস্থিত সবার চোখ কপালে ওঠার মতো ঘটনা। অধ্যক্ষ নাজমুল হক নিজ হাতে চাঁদের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দেন এবং মুখে তুলে দেন মিষ্টি।
এ সময় আবু সাঈদ চাঁদ বলেন, আমি চাই দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে চারঘাট-বাঘাকে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে। নাজমুল হক ভাইয়ের এই শুভেচ্ছা আমাদের পথ চলাকে আরো সহজ করে দিল।
রাজশাহীর এই ঘটনাকে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যা দুর্লভ। বিএনপি-জামায়াতের এই সৌহার্দপূর্ণ আচরণ প্রমাণ করে যে, রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়, এটি জনগণের কল্যাণেরও মাধ্যম।
সামাজিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী আনোয়ার হোসেন বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা যেন আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে গিয়েছিল। সেখানে রাজশাহীর এই চিত্র সত্যিই বিস্ময়কর। এটি শুভেচ্ছা বিনিময় দেশের রাজনীতিতে নতুন ধারা তৈরি করল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ভারতে মুসলিমদের ভয় ও বিরামহীন হতাশার জীবন