বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে খ্যাত লক্ষ্মীপুর জেলা। বিগত সময়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এখান থেকেই নির্বাচন করে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছেন। তৎকালীন সময় আসনগুলো বিএনপির দখলেই ছিল। পরে স্বৈরাচারী কায়দায় আওয়ামী লীগ সে আসনগুলো দখল করে নেয়। জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা।
এখন বিভিন্ন সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণ ও সমর্থক তৈরিতে কাজ করছেন বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা। দলের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে আসন পুনরুদ্ধারে মনোনিবেশ করছেন তারা।
অন্যদিকে লক্ষ্মীপুরের চারটি আসনেই প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলীয় প্রচারে সরব হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটের মাঠে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে তৈরি হচ্ছেন তারা। এ ছাড়া অন্য দলগুলো এখনো তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি। কোনো কোনো দল এখনো গুছিয়ে উঠতে হিমশিম খাচ্ছে।

লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ)
রামগঞ্জ উপজেলা নিয়ে লক্ষ্মীপুর-১ আসন। আসনটিতে বিএনপির একাধিক নেতা তাদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। সেই জায়গায় জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দলীয়ভাবে তাদের প্রার্থীর নাম প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব আলমও আগামী নির্বাচনের লক্ষ্যে তার অবস্থান জানান দিচ্ছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না হলেও এনসিপির হয়ে মাহবুব আলমের বিকল্প আর কেউ নেই। মাহবুব তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ছোট ভাই।
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন রামগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমির নাজমুল হাসান পাটোয়ারী। বিএনপির একাধিক প্রার্থীর কোন্দলে জামায়াতের নাজমুল মাঠ গোছাচ্ছেন। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হিসেবে সংগঠনটির রামগঞ্জ উপজেলা সহসভাপতি মো. জাকির হোসেন পাটোয়ারীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
এ আসনে বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম বিএনপির সব কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে আগামীতে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। তবে এ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হারুনুর রশিদ, রামগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ভিপি আবদুর রহিম, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ইয়াছিন আলী, স্মার্ট টেকনোলজিস বিডি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জিয়াউল হক জিয়ার ছেলে মাশফিকুল হক জয়।
জানতে চাইলে হারুনুর রশিদ বলেন, ‘সব আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম। আমার বিরুদ্ধে ১২৫টি মামলা রয়েছে। তাছাড়া আমি তৃণমূল বিএনপি ও সাধারণ মানুষের মাঝে ছুটে যাই। সে ক্ষেত্রে আমি নিজেকে যোগ্য মনে করছি। এ আসনে এক সময় জিয়াউল হক জিয়া ও নাজিম উদ্দিন জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। আশা করি তাদের পরে জনগণ আমাকে যোগ্য হিসেবে বিবেচনায় রাখবে। তাই দল আমার ওপর আস্থা রাখলে তার প্রতিফলন আমার কাজের মাধ্যমে দেব।’
লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর ও সদরের একাংশ)
লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে এর আগে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে উপনির্বাচনে দুবারই তিনি আসনটি ছেড়ে দেন। খালেদা জিয়ার পরিবর্তে এ আসনটিতে একক অবস্থান ধরে রেখেছেন তার রাজনৈতিক উপদেষ্টা আবুল খায়ের ভূঁইয়া। এ আসনে তিনি বিএনপির হয়ে তিনবার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপির প্রবীণ নেতা হিসেবে তার প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য কাউকে মাঠে দেখা যাচ্ছে না। তবে এর আগে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে জানান দিয়েছিলেন দলটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশিদ হারুন। এবারও তিনি দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে জানা গেছে।
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও জেলা জামায়াতের আমির এসইউএম রুহুল আমিন ভূঁইয়া। সম্প্রতি তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ায় তার পক্ষে দলীয় নেতাকর্মীরা প্রচার চালাচ্ছেন।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলনের এখনো কাউকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি। আসটিতে এনসিপির হয়ে প্রচার চালাচ্ছেন কেন্দ্রীয় সংগঠক আরমান হোসাইন। তিনি বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ছিলেন। এ ছাড়া অন্য দলগুলো এখনো তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি।
জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সংগঠক আরমান হোসাইন বলেন, নির্বাচন বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার টাইমলাইন ছিল ডিসেম্বর থেকে ২৬ সালের জুন পর্যন্ত। এর সঙ্গে এনসিপি শুরু থেকেই একমত। এ সময়ে নির্বাচন হলে এনসিপির কোনো আপত্তি নেই। তবে আমাদের মূল চাওয়া হচ্ছে নির্বাচনের আগে মৌলিক সংস্কার এবং বিচারের দৃশ্যমান অগ্রগতি। যখনই নির্বাচন হোক, এনসিপির কোনো আপত্তি নেই; শুধু জুলাই অভ্যুত্থানকে ধারণ করে নির্বাচনের আগে মৌলিক সংস্কার ও বিচার দৃশ্যমান হতে হবে।
আরমান হোসাইন আরো বলেন, ‘আমরা যখন সাধারণ মানুষের কাছে গিয়েছি, তাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তখন দেখলাম নতুন দলের প্রতি তাদের আগ্রহ রয়েছে। তারা চান একটি নতুন দল আসুক, যারা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করবে, নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করবে, যেখানে চাঁদাবাজি, জবরদখল, মামলা-হামলা-হুমকির কোনো অভিযোগ থাকবে না।’
লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর)
লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনে বিএনপির একক মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে রয়েছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তিনি এর আগেও দুবারের সংসদ সদস্য ছিলেন। আগামীতে তিনি মন্ত্রী হবেন—এমনটি প্রত্যাশা জেলার মানুষের। তার বিকল্প হিসেবে বিএনপিতে আপাতত কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
এদিকে এ্যানির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এখানে রয়েছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম। তিনি দীর্ঘদিন থেকে এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। জানতে চাইলে ড. রেজাউল করিম বলেন, ‘আগামী নির্বাচন আমরা চাই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। তবে তার আগে চাই রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগত সংস্কার, জুলাই গণহত্যার দৃশ্যমান বিচার এবং জুলাই ঘোষণাপত্র। শুধু যেনতেন, আগে যেমন দিনের ভোট রাতে হয়েছে—এমন নির্বাচন আমরা প্রত্যাশা করি না। আমরা চাই একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করে তারপর নির্বাচন দেওয়া হোক।’
আসনটিতে গণঅধিকার পরিষদের নুর মোহাম্মদ, ইসলামী আন্দোলনের ক্যাপ্টেন ইব্রাহীমের নাম শোনা যাচ্ছে। নতুন দল হিসেবে এনসিপি এখনো এ আসনে তাদের সংগঠন গোছাতে পারেনি। জেলা সদর আসন হিসেবে অন্য দলগুলো এখানে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
এ আসন থেকে বিএনপির আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী মো. মোসলেহ উদ্দিন হাওলাদার আরিফ। তিনি অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ বিএনপির সভাপতি ও অস্ট্রেলিয়া বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক।
এ ছাড়া খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী রয়েছেন মাওলানা মোহাম্মদ ফয়সাল। তিনি দলটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর)
এদিকে লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসন নিয়ে ভাবাচ্ছে বিএনপিকে। এ আসনে জোটগত কারণে কেন্দ্রীয় বিএনপির পক্ষ থেকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রবকে সমর্থন করার জন্য বললেও তৃণমূলের বিএনপি চাচ্ছে এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজানকে। তিনি এর আগে ২০০১ ও ২০০৮ সালে এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে এমপি হন। তবে ২০১৮ সালের নির্বাচনে জোটগতভাবে আ স ম রবকে সমর্থন করে বিএনপি। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাছে হেরে যান তিনি। বর্তমানে রামগতি-কমলনগরে দলীয় কর্মকাণ্ড করে দল গোছাচ্ছেন আশরাফ উদ্দিন নিজান। আর আ স ম রব অসুস্থ থাকায় এ আসনে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তার স্ত্রী তানিয়া রব।
এদিকে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে কার্যক্রম চালাচ্ছেন জেলা জামায়াতের সাবেক নায়েবে আমির ও বর্তমান সেক্রেটারির দায়িত্বপ্রাপ্ত এআর হাফিজ উল্যাহ। তবে উপকূলীয় এ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হিসেবে জনপ্রিয়তা রয়েছে আল্লামা খালেদ সাইফুল্লার। বিগত আওয়ামী লীগ আমলে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ইউপি চেয়ারম্যান থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাসিবুর রহমান বলেন, লক্ষ্মীপুর হচ্ছে বিএনপির ঘাঁটি। এখানে আমাদের দল যাকেই মনোনয়ন দেবেÑতিনিই ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী হবেন। ঐতিহ্যগতভাবেই এখানে আমরা বিজয়ী হয়ে আসছি। এর আগে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালে যতগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হয়েছে, প্রত্যেকটিতেই আমরা জয়লাভ করেছি। আগামীতেও নির্বাচন নিরপক্ষে হলে ইনশাআল্লাহ চারটি আসনেই জয়লাভ করব।
আসনটিতে বিএনপির আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রয়াত শফিউল আলম বাবুর সহধর্মিণী বীথিকা বিনতে হোসাইন। তিনি সামাজিক সংগঠন অর্পণ আলোক সংঘের চেয়ারম্যান।
শিক্ষাবিদ ও সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) লক্ষ্মীপুরের সদস্য অধ্যাপক জেডএম ফারুকী বলেন, ‘আমরা নিরপেক্ষ ও কারচুপিমুক্ত নির্বাচন চাই। কিন্তু যদি রাজনৈতিক দলগুলো আবার আগের অবস্থানে ফিরে যায়, তাহলে দেশ খুবই অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

