মাছের আকালে পেশা বদলাচ্ছেন জেলেরা

মাছের আকালে পেশা বদলাচ্ছেন জেলেরা

প্রাকৃতিক প্রাচুর্যের একসময়কার উত্তাল ব্রহ্মপুত্র এখন নাব্য সংকটে মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। নাব্য সংকটে এখন অস্তিত্ব হারাতে বসেছে একসময়ের খরস্রোতা এই নদ। এই নদের বুকজুড়ে চর আর নাব্য সংকটের কারণে চিরচেনা সেই পরিবেশ আজ হারিয়ে যাচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় চরম দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী শতাধিক জেলে।

পেটের টানে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন তারা। আর এই বিপর্যয়ের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন ও আবহাওয়ার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নদীকর্মী জাহানুর রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বর্ষা মৌসুমে আগের মতো নিয়মিত ও পরিমিত বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। কখনো দীর্ঘস্থায়ী খরা, আবার কখনো অসময়ে আকস্মিক বন্যা দেখা দিচ্ছে। এতে মাছের স্বাভাবিক প্রজননচক্র ব্যাহত হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে নদীর পানির স্বাভাবিক তাপমাত্রা ও দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রাতেও পরিবর্তন ঘটছে। ফলে দেশীয় অনেক প্রজাতির মাছ মারা যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আবার অনেক প্রজাতি ডিম ছাড়ার উপযোগী পরিবেশ হারাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে বালুচর জেগে ওঠা এবং বর্ষায় অতিরিক্ত ঢলের কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ও পরিবেশ ব্যবস্থা নষ্ট হচ্ছে। এতে মাছের নিরাপদ আবাসস্থল ও খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ছে। পর্যাপ্ত পানি না থাকায় নদী তার গভীরতা হারাচ্ছে। ফলে দেশীয় মাছের প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় গভীর ও নিরাপদ স্থানও কমে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত কুড়িগ্রামে মোট ৯৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে জুনে ৪৭৩ মিলিমিটার, জুলাইয়ে ৩৭৮ মিলিমিটার এবং আগস্টে মাত্র ১২৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক শামছুদ্দোহা সৌমিক বলেন, গত দুই-তিন বছরে মৌসুমি বন্যার স্থলে আকস্মিক স্বল্পস্থায়ী সাময়িক বন্যার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জেলার নদনদী অববাহিকায় মৌসুমি বড় বন্যার জন্য টানা এক থেকে দুই সপ্তাহ ভারী বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বৃষ্টির ধরনে একটা পরিবর্তন এসেছে। যখন যতটা হওয়ার কথা তখন ততটা হচ্ছে না। অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত বৃষ্টি হচ্ছে। বাকি সময় থাকছে বৃষ্টিহীন। বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় মৎস্যজীবীদের মতে, ব্রহ্মপুত্রের গভীর ও উপযুক্ত স্থানগুলোতে স্থায়ী ‘মৎস্য অভয়াশ্রম’ ঘোষণা করতে হবে, যেখানে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। এছাড়া অবৈধ কারেন্ট ও চায়না দুয়ারী জালের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। নদের নাব্য ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ও পরিকল্পিত ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে, যাতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও গভীরতা বজায় থাকে।

এ বিষয়ে চিলমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক জানিয়েছেন, ব্রহ্মপুত্র নদে পানি কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মাছের প্রজনন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। তবে মৎস্যসম্পদ রক্ষায় আমরা নিয়মিত নদীতে অভিযান চালাচ্ছি এবং অবৈধ কারেন্ট ও চায়না দুয়ারী জাল জব্দের পাশাপাশি ধ্বংস করা হচ্ছে। তাছাড়া জেলেদের বিকল্প আয়ের পথ তৈরিতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সহায়তার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন