আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

খুশির জন্মদিন আর হলো না

জসীম উদ্দিন, সুনামগঞ্জ

খুশির জন্মদিন আর হলো না

জন্মদিনে নতুন জামা কেনার কথা ছিলো। মা তামান্না অপেক্ষায় ছিলেন, মেয়ের মুখে হাসি ফুটবে বলে। সন্ধ্যায় বান্ধবীরা আসবে, ঘটা করে পালন হবে জন্মদিন। এই ছিলো পরিকল্পনা। কিন্তু সেই আনন্দের দিনেই সড়কে ঝরে গেলো আফসানা জাহান খুশির প্রাণ। জন্মদিনের কেকের বদলে সাজানো হলো লাশ। নতুন জামার বদলে কেনা হলো কাফনের কাপড়।

বিজ্ঞাপন

খুশি ছিলেন সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের ম্যানুফ্যাকচারিং টেকনোলজি বিভাগের দ্বিতীয়বর্ষের শিক্ষার্থী। শহরের আরফিননগরের বাসিন্দা হলেও পড়াশোনার সুবিধার্থে আলীপাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। গান গাইতে পারতেন চমৎকার, ছিলেন মেধাবী ও প্রাণবন্ত।

পরিবার জানায়, গত বছর শান্তিগঞ্জ টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয় খুশি। পরীক্ষায় ভালো ফল করে এবার দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হয়। গত বুধবার ছিলো তার দ্বিতীয়বর্ষের প্রথম ক্লাস, আর একইসঙ্গে ছিলো তার জন্মদিন।

বাবা দেলোয়ার হোসেন মেয়েকে কলেজে যেতে নিষেধ করেছিলেন। বলেছিলেন, আজ জন্মদিন, ক্লাসে না গেলেও চলবে। কিন্তু খুশি পারেনি। সহপাঠীরা কলেজে জন্মদিনের কেক বানিয়েছে, উপহার কিনেছে। তাদের অনুরোধে ক্লাস শেষে জন্মদিন পালন করে খুশি। এরপর দ্রুত শহরে ফেরার জন্য একটি সিএনজি অটোরিকশায় ওঠে। কারণ বাসায় মা অপেক্ষায় ছিলেন। সন্ধ্যায় বান্ধবীরা আসবে, ঘটা করে জন্মদিন পালন হবে। মা তামান্নাকে নিয়ে মার্কেটে যাবে, নতুন জামা কিনবে।

কিন্তু বাহাদুরপুর এলাকায় পৌঁছাতেই ঘটে দুর্ঘটনা। একটি বাস সিএনজিকে চাপা দেয়। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় আফসানা জাহান খুশি। তার মেরুদণ্ড ও হাত ভেঙে যায়, মাথায় মারাত্মক আঘাত লাগে। মগজ বেরিয়ে পড়ে। চেহারা এতটাই বিকৃত হয়ে যায় যে প্রথমে তাকে শনাক্ত করাই কঠিন হয়ে পড়ে।

মা তামান্না বলেন, আমার শেষ ভরসা ছিলো মেয়েটি। হাঁটতে পারি না, মেয়েটির হাত ধরে চলতাম। সে বলতো, ‘মা আমি তোমার লাঠি।’ জন্মদিনে নতুন জামা কিনে দেবো বলে অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু জন্মদিন আর পালন হলো না। নতুন জামার বদলে কাফনের কাপড় কিনতে হলো।

খুশির মোবাইলে পাওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সে মাকে উদ্দেশ্য করে বলছে, ‘আম্মা তুমি বেঁচে থাকো। তুমি মরে গেলে আমি থাকতে পারতাম না। আমি আগে মরব। নামাজ পড়ে সবসময় দোয়া করি আল্লাহ যেন আমার আগে তোমারে নেন না। তুমি ছাড়া আমি এক মুহূর্ত থাকতাম না।’

পিতা দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমার দুই মেয়ে। খুশি সবার ছোট। তার ইচ্ছে ছিল বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবে। পরিবারের মুখে হাসি ফুটাবে। কিন্তু তা হয়ে উঠল না। তার স্বপ্ন সড়কে ঝরে গেলো। প্রতিদিন সিএনজি, লেগুনা করে ১৯ কিলোমিটার দূরে ইনস্টিটিউটে পড়তে যেতো। এখন ঘুমুতে পারি না। খুশির কথা বারবার মনে পড়ে।

তিনি এ মৃত্যুর জন্য বাসকে দায়ী করে বলেন, সড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলে, অদক্ষ চালক। এ জন্য রাষ্ট্র দায়ী। আমরা ক্ষতিপূরণ চাই না। আমি চাই বাস মালিক ও চালকের ফাঁসি হোক।

খুশির মামা সদরুল আলম সাইফুল বলেন, মানুষের জীবন নিয়ে অসাধু বাস মালিকরা ব্যবসা করছে। সড়কে লাইসেন্সবিহীন, ফিটনেসবিহীন বাসের ছড়াছড়ি। অদক্ষ চালকদের দিয়ে বাস চালানো হয়। চালকের বেতন কম, মালিকের মুনাফা বেশি। মালিকদের মুনাফার কাছে মানুষের জীবন তুচ্ছ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এসব গাড়ি। রাষ্ট্রকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুবা একের পর এক প্রাণহানি ঘটতেই থাকবে।

শুধু আফসানা জাহান খুশি নয়, তার সঙ্গে একই সিএনজিতে ছিলেন সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী স্নেহা চক্রবর্তী। তার বাবা বিপুল চক্রবর্তী মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে সিএনজিতে তুলে দেন। মাত্র ১০ মিনিট পর আসে মৃত্যুর খবর।

স্নেহার বাড়ি শান্তিগঞ্জ উপজেলায় হলেও তিনি সুনামগঞ্জ শহরে থাকতেন। তার পরিবারে চলছে কান্নার আহাজারি।

উল্লেখ্য, গত বুধবার দুপুরে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের বাহাদুরপুর নামক স্থানে সিএনজি-বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই শিক্ষার্থীসহ তিনজনের মৃত্যু হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন