ওমানের রাজধানী মাস্কেট উপকূল থেকে পাঁচ নটিক্যাল মাইল দূরে মার্শাল আইল্যাণ্ডের পতাকাবাহী জাহাজে মিসাইল হামলার শিকার চার বাংলাদেশি দেশে ফিরেই ভয়াবহ সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তারা ভারতীয় নাগরিক এক সহকর্মীকে বাঁচাতে সাহসিকতার এক অনন্য নজিরের কথা স্মরণ করে নিজেরাও অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরার কথা জানান। এমনকি জাহাজটিতে গ্যাসোলিন কার্গোর ভয়াবহ বিস্ফোরণের আশঙ্কা দেখা দিলেও দুই বাংলাদেশীসহ নাবিকদের চার সদস্যের দুটি টিম ২২জন নাবিককে নিরাপদে সরাতে সক্ষম হয়।
শনিবার নাবিকদের সংগঠন বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে নাবিকদের বরাত দিয়ে ঘটনার বর্ণনা গণমাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। (BMMOA)। এতে বলা হয়, গত ১ মার্চ পার্সিয়ান গাল্ফে ‘MKD VYOM’ নামক জাহাজে ভয়াবহ মিসাইল হামলা করা হয়। জাহাজটি একটি ক্রুড অয়েল বাহী ট্যাঙ্কার। ওমানে তেল আনা নেওয়া করে থাকে এটি। সেখানে ২২ জন নাবিক ছিলেন। এর মধ্যে চারজন বাংলাদেশি। আর বেশিরভাগই ভারতীয় নাগরিক। এর মধ্যে একজন ভারতীয় মারা গেছেন। তবে তাকে শুরুতে জীবিত উদ্ধারে জীবন ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করেন চার বাংলাদেশি। পরে তার মরদেহ উদ্ধারেও চরম ঝুঁকি নিতে হয় তাদের।
বিবৃতিতে জানানো হয়, জাহাজটিতে ৬০ হাজার মেট্রিক টন দাহ্য গ্যাসোলিন ছিল। বিস্ফোরণের পর জাহাজে লাগা আগুন এবং বিষাক্ত ধোঁয়ার নরককুণ্ড থেকে তারা ফিরে আসেন। তবে একজন সহকর্মীকে বাঁচাতে যেই ভূমিকা রেখেছেন তা কখনও ভুলে যাওয়ার নয় বলে তারা মনে করে। গত ৫ ও ৬ মার্চ তারা বাংলাদেশে নিজেদের বাড়িতে ফিরেছেন। যদিও নাবিকদের কার বাড়ি কোন জেলায় তা জানায় নাবিকদের সংগঠন বিএমএমওএ।
ফিরে আসা বাংলাদেশিরা হলেন- জাহাজের সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমান, থার্ড অফিসার মো. মনিরুল আলম জয়, থার্ড ইঞ্জিনিয়ার রিফাত মাহমুদ, ইলেক্ট্রিশিয়ান মোহাম্মদ আবু নাছের।
বিবৃতিতে বলা হয়, ভি শিপ ম্যানেজমেন্ট পরিচালনাধীন জাহাজটি গত ১ মার্চ সকালে পার্সিয়ান গাল্ফে অবস্থান করেছিল। স্থানীয় সময় সকাল ৯টা থেকে জাহাজটি স্রোতে ভেসে চলা শুরু করে। কিন্তু বেলা ১১টা ৪৫ মিনিট থেকে ১২টার মধ্যে হঠাৎ একটি শক্তিশালী মিসাইল জাহাজে আঘাত হানে। সেটি জাহাজের ইঞ্জিন রুম জেনারেটর ফ্লোরে পড়ে। মুহূর্তেই বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো জাহাজ ও ইঞ্জিন রুমে আগুন ধরে যায়। এতে ইঞ্জিন রুমে ১০-১২ ফুট ব্যাসের বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়। এসময় একজন ভারতীয় নাবিক (অয়েলার) নিখোঁজ হয়ে যায়। সাগর থেকে বালতি দিয়ে পানি নিয়ে আগুন নেভানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন চার বাংলাদেশি। সেইসাথে তারা নিখোঁজ সহকর্মীকে খুঁজতে সাহসী ভূমিকা রাখেন। তবে শেষ পর্যন্ত ভারতীয় ওই নাবিককে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার সময় সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমান এবং নিখোঁজ অয়েলার (ভারতীয়) ইঞ্জিন রুমের বটম প্ল্যাটফর্মে ছিলেন। তাদের চোখের সামনেই ঘটে বিশাল বিস্ফোরণ। আগুনের লেলিহান শিখায় সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার হাবিবের মাথাও হাতের কিছু অংশ দগ্ধ হয়। বিষাক্ত গ্যাসে তার শ্বাসনালি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
অন্ধকার আর কালো ধোঁয়ার ভেতরে এস্কেপ রুট দিয়ে তিনি জাহাজের ব্রিজে পৌঁছান। সেখানে ক্যাপ্টেন ও থার্ড অফিসার জয় তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। সেসময় ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার, ইলেকট্রিশিয়ান ও অন্যান্যরা ইঞ্জিন কন্ট্রোল রুমে ছিলেন। তখন ছাদ ভেঙে তাদের গায়ের ওপর পড়লেও বড় কোনো আঘাত ছাড়াই তারা বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়।
বেঁচে ফেরা নাবিকরা আরও জানান, জাহজের ইঞ্জিন রুমে ছড়িয়ে পড়া আগুনের বিষাক্ত ধোঁয়া বেরিয়ে আসে জাহাজের ফানেল ডেক দিয়ে। আগুনে দগ্ধ এবং বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার হাবিব প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে সহকর্মীদের রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরবর্তীতে সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার ও চিফ অফিসারের নেতৃত্বে চারজন করে দুটি টিম করা হয়।
তারা ফায়ার ফাইটিং করে এবং নিখোঁজ অয়েলারকে উদ্ধারে অপারেশন শুরু করে। এসময় সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার নিখোঁজ অয়েলারকে জাহাজের স্টার বোর্ড সাইডের (ধ্বংসস্তূপ) মাঝে মৃত অবস্থায় খুঁজে পান। পরে চীফ অফিসার ও ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ারসহ অন্যান্যরা মৃতদেহটি সিলিংয়ে বেঁধে বের করার চেষ্টা করে। কিন্তু সেসময় আবারও ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ।
সহকর্মীর নিথর মরদেহ সিলিংয়ে রেখে চলে আসতে হয়। বিস্ফোরণে সকলের শরীরে লুব অয়েল ছিটিয়ে পড়ে এবং আগুনের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায়। ধ্বংসাবশেষে তীব্র ধোঁয়া, অন্ধকার এবং অকেজো বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাঝে নাবিকেরা প্রায় ৪-৫ ঘণ্টা ধরে কয়েক দফায় ফায়ার ফাইটিং করতে থাকেন।
এক পর্যায়ে পোর্টেবল এক্সটিংগুইশার শেষ হয়ে গেলে, নাবিকেরা রশির সাহায্যে সমুদ্র থেকে বালতি দিয়ে পানি উত্তোলন করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। এতে নাবিকদের অনেকে আহত হয়। একইদিন সন্ধ্যায় জাহাজে গ্যাসোলিন কার্গোর বিস্ফোরণের ঝুঁকি থাকায় জাহাজ পরিত্যাগের নির্দেশ দেন জাহাজ ক্যাপ্টেন।
জাহাজের নাবিকদের সরাতে চিফ অফিসার, সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার এবং থার্ড অফিসারের নেতৃত্বে দুটি টিম দুটি লাইফ বোটে উদ্ধার শুরু করে। এ সময় তারা নাবিকদের ইমার্জেন্সি রিলিজ করে ভিয়েতনামের জাহাজ এমটি স্যাণ্ডে পাঠিয়ে দেয়।
বিবৃতি জানানো হয়, গত ৪ মার্চ রাতে এই ৪ বাংলাদেশি নাবিক নিরাপদে দেশে ফেরেন। প্রক্রিয়া শেষে কেউ ৫ মার্চ এবং কেউ ৬ মার্চ বাড়িতে ফিরেন।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্সএসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মো. আনাম চৌধুরী বলেন, ভয়ংকর পরিস্থিতিতে সাহসিকতার সাথে এ ধরনের ফায়ার ফাইটিং করার উদাহরণ খুব কমই রয়েছে। এই ঘটনায় আমাদের দেশের চার নাবিকসহ অন্যান্য নাবিকেরামিলে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করলেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

