আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

প্রার্থীদের ব্যয়সীমা লঙ্ঘন

নিজেদের নিয়মই মানতে পারল না ইসি

জমির উদ্দিন, চট্টগ্রাম

নিজেদের নিয়মই মানতে পারল না ইসি

নির্বাচনি ব্যয়ের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের লক্ষ্যে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। চট্টগ্রামের চারটি সংসদীয় আসনে প্রার্থীরা নিজেরাই হলফনামায় নির্ধারিত ব্যয়সীমা অতিক্রম করার কথা স্বীকার করলেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) তাদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে। এতে করে ইসির নিরপেক্ষতা ও আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আইন মন্ত্রণালয়ের গেজেট অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য প্রার্থী নিজ নিজ আসনে প্রতি ভোটারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ টাকা নির্বাচনি ব্যয় করতে পারবেন। এই সীমা অতিক্রম করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। সংশোধিত আরপিও-২০২৫ অনুযায়ী, ব্যয়সীমা লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু চট্টগ্রামের চারটি আসনের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রার্থীরা নিজেরাই নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এসব মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন।

রাঙ্গুনিয়ার চট্টগ্রাম-৭ আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ১৯ হাজার আটজন। সে অনুযায়ী হুম্মাম কাদের চৌধুরীর সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা ছিল ৩১ লাখ ৯০ হাজার ৮০ টাকা। কিন্তু তিনি হলফনামায় ব্যয় দেখিয়েছেন ৩৮ লাখ টাকা, যা নির্ধারিত সীমার চেয়ে ছয় লাখ ১০ হাজার টাকা বেশি।

রাউজানের চট্টগ্রাম-৬ আসনে ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৩৯ হাজার ৯৮৮ জন। এখানে গিয়াস কাদের চৌধুরীর ব্যয়সীমা ছিল ৩৩ লাখ ৯৯ হাজার ৮৮০ টাকা। অথচ তিনি ব্যয় দেখিয়েছেন ৩৫ লাখ টাকা, যা সীমার চেয়ে এক লাখ টাকারও বেশি।

আনোয়ারা-কর্ণফুলীর চট্টগ্রাম-১৩ আসনে সরওয়ার জামাল নিজামের ক্ষেত্রে ব্যয়সীমা ছিল ৩৯ লাখ ৫২ হাজার ৪০০ টাকা। তিনি হলফনামায় ব্যয় দেখিয়েছেন ৬০ টাকা বেশি। অঙ্কটি সামান্য হলেও আইনগতভাবে এটি স্পষ্ট লঙ্ঘন।

সাতকানিয়ার চট্টগ্রাম-১৫ আসনে শাহজাহান চৌধুরীর ব্যয়সীমা ছিল ৫০ লাখ ৬০ হাজার ৫৯০ টাকা। তিনি হলফনামায় মোট ব্যয় দেখিয়েছেন ৫০ লাখ ৬২ হাজার ৫৯০ টাকা অর্থাৎ দুই হাজার টাকা বেশি।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যয়সীমা লঙ্ঘন হলে সংশ্লিষ্ট হলফনামা ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা এবং ইসির অনুমোদন ছাড়া তা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু এই চারটি ক্ষেত্রে রিটার্নিং কর্মকর্তারা কোনো আপত্তি ছাড়াই মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছেন, যা নির্বাচনি আইন ও ইসির নিজস্ব নির্দেশনার পরিপন্থী।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, আরপিও সংশোধনের পর এটি ছিল নির্বাচন কমিশনের প্রথম বড় পরীক্ষা। কিন্তু এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে ইসি নিজেদেরই তৈরি করা নিয়ম মানতে ব্যর্থ হয়েছে। এটি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং নির্বাচন পরিচালনায় শৃঙ্খলার অভাবের প্রতিফলন।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ভোটারপ্রতি নির্ধারিত সীমার বেশি ব্যয় করা সুস্পষ্টভাবে আরপিও লঙ্ঘন। প্রার্থীরা ভুল হিসাব করে থাকতে পারেন—এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। আইন লঙ্ঘন মানেই লঙ্ঘন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, ব্যয়ের হিসাব যাচাই করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদেরই ছিল।

তবে এ বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা সাড়া দেননি।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রার্থীরা যখন নিজেরাই লিখিতভাবে আইন ভাঙার কথা স্বীকার করেন এবং তবুও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তখন তা ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করে। এতে নির্বাচনি প্রতিযোগিতার আর্থিক সমতা, স্বচ্ছতা ও জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...