জাতীয় পর্যায়ে ১০০ মিটার দৌড়ে প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয়

সেই অদম্য রিফাতের পাশে দাঁড়ালেন ইউএনও

উপজেলা প্রতিনিধি, কিশোরগঞ্জ (নীলফামারী)

সেই অদম্য রিফাতের পাশে দাঁড়ালেন ইউএনও

জীবনের প্রতিটি ধাপে অভাব যেন তার নিত্যসঙ্গী। ছোটবেলায় হারিয়েছেন মাকে, বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে দূরে থাকেন। মাথা গোঁজার মতো ঘর নেই, নেই আর্থিক সচ্ছলতা। বৃদ্ধ দাদীর কষ্টার্জিত সামান্য আয়েই চলে তার জীবন ও পড়াশোনা। এত প্রতিকূলতার মাঝেও স্বপ্ন দেখতে থেমে থাকেনি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার শিশু রিফাত ইসলাম।

অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং খেলাধুলার প্রতি গভীর অনুরাগ তাকে এনে দিয়েছে জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য। প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার ১০০ মিটার দৌড়ে জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে আলোচনায় এসেছে এই সংগ্রামী কিশোর।

বিজ্ঞাপন

রিফাত ইসলাম কিশোরগঞ্জ উপজেলার পুটিমারী ইউনিয়নের লালজুম্মাপাড়া গ্রামের মজিদুল হকের ছেলে। বর্তমানে সে উত্তর কালিকাপুর পশ্চিমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মাত্র পাঁচ বছর বয়সে রিফাত তার মাকে হারায়। এরপর তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। সেই থেকে বৃদ্ধ দাদীর স্নেহ-ভালোবাসা আর সংগ্রামের মধ্যেই বেড়ে উঠছে রিফাত। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাহায্য সংগ্রহ করে কিংবা যা কিছু পান, তা দিয়েই নাতির খাবার ও পড়াশোনার খরচ চালানোর চেষ্টা করেন তার দাদী।

দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতাকে সঙ্গী করেও রিফাত কখনো স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেনি। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও সমান আগ্রহী সে। বিশেষ করে দৌড় প্রতিযোগিতায় তার অসাধারণ দক্ষতা রয়েছে। সেই প্রতিভার স্বীকৃতি মিলেছে জাতীয় পর্যায়ে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার ১০০ মিটার দৌড়ে রিফাত প্রথমে উপজেলা, পরে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। সেখানে দেশের সেরা প্রতিযোগীদের সঙ্গে লড়াই করে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে সে। পরে শিক্ষা উপদেষ্টা আ ন ম এহসানুল হক মিলনের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করে রিফাত।

রিফাতের সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় প্রশাসনের নজরে এলে বুধবার বিকেলে তার বাড়িতে ছুটে যান কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুর রহমান। এ সময় ইউএনওকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে রিফাত। নিজের স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে সে।

রিফাতের মানবেতর জীবনযাত্রা দেখে তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার পরিবারের জন্য দুই বান্ডিল ঢেউটিন, নগদ ৬ হাজার টাকা, শুকনো খাবার ও একটি কম্বল প্রদান করা হয়।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জাকির হোসেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা লতিফুর রহমান, উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আতাউল গনি ওসমানী, উত্তর কালিকাপুর পশ্চিমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওবায়দুর রহমানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

সহায়তা পেয়ে রিফাত ইসলাম বলেন, “আমি লেখাপড়া করে বড় হতে চাই। দেশের সেরা দৌড়বিদ হয়ে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনতে চাই। আমার স্বপ্ন পূরণে সবাই যেন পাশে থাকেন, সেই সহযোগিতা চাই।”

রিফাতের প্রধান শিক্ষক ওবায়দুর রহমান বলেন, “রিফাত অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী একজন শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও তার অসাধারণ প্রতিভা রয়েছে। সঠিক পরিচর্যা ও সহযোগিতা পেলে সে ভবিষ্যতে দেশের জন্য গর্ব বয়ে আনতে পারবে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, “রিফাতের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও সংগ্রামের গল্প আমাকে মুগ্ধ করেছে। তার মতো মেধাবী ও সংগ্রামী শিশুর পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার পড়াশোনা ও খেলাধুলার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। আমরা তাকে শিশু সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় এনে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার বিষয়েও চিন্তা করছি। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও শুভাকাঙ্ক্ষীদেরও তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।”

অভাব-অনটনের মাঝেও স্বপ্নকে বুকে লালন করে এগিয়ে চলা রিফাত আজ অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার নাম। তার এই সংগ্রামী পথচলা প্রমাণ করে—দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে প্রতিকূলতাকেও জয় করা সম্ভব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...