কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার আটটি ইউনিয়নে অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও উজানের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত বিশেষ প্রণোদনা বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। তবে সরকারি এই সহায়তার তালিকা প্রকাশ হতেই পুরো উপজেলায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে তালিকায় স্থান পেয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, তাদের আত্মীয়-স্বজনদের নাম। এমনকি তালিকায় এমন ব্যক্তিদের নামও রয়েছে, যারা দীর্ঘদিন আগে মারা গেছেন কিংবা বছরের পর বছর ধরে প্রবাসে অবস্থান করছেন। অনেকেই জীবিকার তাগিদে স্থায়ীভাবে ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামে বসবাস করছেন এবং ঈদ ছাড়া এলাকায় আসেন না, অথচ তারাও এখন সরকারি খাতা-কলমে ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক।’ অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাঙালপাড়া ইউনিয়নের ওসমানপুর গ্রামের মৃত ইসহাক মিয়া (পিতা. মৃত হোসেন আলী) দীর্ঘদিন আগে মারা গেলেও তার নাম রয়েছে ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায়। এছাড়া দেওঘর ইউনিয়নের আলীনগর গ্রামের অলি মিয়া (পিতা. ইসাম উদ্দিন) এবং দেওঘর গ্রামের সোহেল আহমেদ (পিতা. ধন মিয়া) দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে অবস্থান করলেও রহস্যজনকভাবে তাদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কাস্তুল ইউনিয়নের তালিকায় দেখা গেছে, ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তোয়াব মিয়া, যুবদল সভাপতি ফারুক এবং বাদল— এদের প্রত্যেকেরই স্ত্রী, সন্তানসহ পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম তালিকায় রয়েছে। অন্যদিকে, সদর ইউনিয়নের তালিকায় বিএনপির বড় নেতাদের নাম ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের নামের ছড়াছড়ি।
সদর ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক কাজী মঞ্জু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি ১০ একর জমিতে চাষাবাদ করেছিলাম। তার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। অথচ সরকারি তালিকায় আমার নাম নেই। এখন দেখছি কৃষক হওয়া লাগে না, শুধু পদবিওয়ালা নেতাদের পিছনে ঘুরলেই বউ, জি (মেয়ে), পুত (ছেলে) সবার নামই তালিকায় ঢুকে যায়।’
ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষক কলাপড়ার বাপ্পি মিয়া বলেন, ‘দুই-তিনটি পাড়ায় প্রায় প্রতি ঘরেই নারী-পুরুষসহ একাধিক নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে। অথচ এমন পাড়াও আছে, যেখানে একজন প্রকৃত কৃষকের নামও নেই। অষ্টগ্রামে মহিলা কৃষক আছে—আমি এই প্রথম শুনলাম।
হাবেলী পাড়ার বর্গাচাষি মালেকের এবং দাসপাড়ার কৃষক রেজাউল ইসলাম রেজুর নামও তালিকায় নেই। অথচ মালেকের ২০ একর জমির মধ্যে ১৫ একর এবং রেজুর ৩০ একর জমির মধ্যে ২১ একর ফসল পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল।
তালিকার এই অনিয়ম নিয়ে বাঙালপাড়া, দেওঘর, পূর্ব অষ্টগ্রাম ও আদমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জনপ্রতিনিধি বলেন, ‘প্রশাসনসহ এলাকার সকলেই জানে এই তালিকা কীভাবে তৈরি হয়েছে। আমরা জনপ্রতিনিধিরা শুধু তালিকায় স্বাক্ষরকারী মাত্র।
অষ্টগ্রাম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু বলেন, আমার প্রস্তাব ছিল প্রশাসনের মাধ্যমে প্রতিটি সেচ প্রকল্পের ম্যানেজারের কাছে প্রকৃত কৃষকদের যে তালিকা রয়েছে, তা থেকে যাচাই-বাছাই করে কৃষক নির্বাচন করলে এমনটা হতো না।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মজনু মিয়া বলেন, ইতোমধ্যে ইউএনও আটজন সরকারি কর্মকর্তাকে প্রধান করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট আটটি কমিটি করে দিয়েছেন। তাদের তদারকিতে প্রত্যেককে তিন হাজার টাকা ও ১৫ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ বলছেন, এখনই প্রকৃত কৃষকদের অধিকার ফিরিয়ে না দিলে গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়ার পাশাপাশি সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

