চট্টগ্রামে একের পর এক সরকারি দপ্তরে হামলা, কর্মকর্তাদের হুমকি এবং টেন্ডার-সংক্রান্ত উত্তেজনার ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মাঠে নেমেছে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে আলোচনায় এসেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ পতিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সন্দ্বীপ পৌরসভা শাখার সহসভাপতি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লাকি এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ওরফে রয়েল নাসিরের নাম।
সূত্রগুলোর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষা প্রকৌশল, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল ও এলজিইডিতে একক আধিপত্য ছিল তার। এসব দপ্তর থেকে ১০টি কাজ বের হলে এককভাবে তার পাঁচটিই পেয়ে যেত নাসিরের লাকি এন্টারপ্রাইজ। অবাক করা তথ্য হলো, দুই বছর আগে আওয়ামী লীগের পতন হলেও এই তিন দপ্তরে এখনো লাকি এন্টারপ্রাইজের রয়েছে একক আধিপত্য। একই সঙ্গে অন্যান্য সরকারি দপ্তরের টেন্ডার কার্যক্রমেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি দপ্তরের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা, প্রভাবশালী ঠিকাদার ও সন্ত্রাসী চক্রের সহায়তায় তিনি এখনো চট্টগ্রামের সরকারি নির্মাণকাজে একক আধিপত্য ধরে রেখেছেন। তার কথার অবাধ্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মবের শিকার হওয়ার পাশাপাশি প্রাণনাশের হুমকি পান।
গত ২১ জুন এলজিইডি চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সামনে অগ্রিম বিল পরিশোধের দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ফটিকছড়ির সাবেক সংসদ সদস্য নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত আসাদুজ্জামান টিটুকে সঙ্গে নিয়ে ওই কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন রয়েল নাসির। মানববন্ধন শেষে দলবেঁধে কার্যালয়ে ঢুকে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে হেনস্তাও করেন তিনি। এ সময় চট্টগ্রামের এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মতিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তার কার্যালয়ে মবের পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। ঘটনার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে কয়েক দিন নিয়মিত অফিসে আসতে পারেননি নির্বাহী প্রকৌশলী।
এলজিইডির একাধিক সূত্র জানায়, নিয়ম অনুযায়ী অর্থবছর শেষে অসমাপ্ত প্রকল্পের অব্যবহৃত বরাদ্দ ল্যাপস হয়ে যায় এবং পরবর্তী অর্থবছরে নতুন করে চাহিদাপত্র দিয়ে বরাদ্দ আনতে হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেশ কয়েকটি অসমাপ্ত প্রকল্পের ২৫ কোটি টাকা ল্যাপস করার প্রক্রিয়া শুরু করে চট্টগ্রাম এলজিইডি অফিস। এই খবর পেয়ে রয়েল নাছিরের নেতৃত্বে একদল কথিত ঠিকাদার অফিসে এসে চাপ সৃষ্টি করে। তাদের দাবি ছিল, কাজ সম্পন্ন হয়েছে— এমন প্রতিবেদন দিয়ে অগ্রিম বিল পরিশোধ করতে হবে।
সূত্র জানায়, অগ্রিম বিল নিয়ে কাজ শেষ না করার একাধিক নজির রয়েছে চট্টগ্রামে। মিরসরাই উপজেলার একটি প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি সেতু সংস্কার কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শামস ইঞ্জিনিয়ারিং অগ্রিম বিল নিলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করেনি। বর্তমানে চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে। রাঙ্গুনিয়া উপজেলার একটি রাস্তা উন্নয়ন কাজে মেসার্স আবসার কনস্ট্রাকশনকেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অগ্রিম বিল দেওয়া হয়। গত তিন বছরে তিনি কোনো কাজই করেননি। এই চুক্তিটিও বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে। আনোয়ারা উপজেলার ময়না গাজী রোড উন্নয়ন কাজের ঠিকাদার মেসার্স শাহ জব্বারিয়া কনস্ট্রাকশন ২০২২ সালের জুন মাসে অগ্রিম বিল নিয়েও কাজ করেননি। অভিযোগ রয়েছে, এলজিইডি অফিসের কর্মকর্তা নুরুচ্ছফার ইন্ধনে রয়েল নাসির ও আসাদুজ্জামান টিটুর নেতৃত্বে একদল ঠিকাদার একাট্টা হয়ে অফিসের কর্মকর্তাদের ওপর অগ্রিম বিলের জন্য চাপ সৃষ্টি করে আসছে।
এর তিনদিন আগে গত ১৮ জুন শিক্ষা প্রকৌশল অফিসেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে। অস্ত্রধারী একদল ব্যক্তি অফিসে ঢুকে দুই কর্মচারীকে মারধর এবং নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর ইসলামকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। এ বিষয়ে তানভীর ইসলাম মন্তব্য করতে রাজি না হলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা আমার দেশকে জানান, আওয়ামী লীগের সময় থেকেই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বড় বড় কাজ একচেটিয়াভাবে বাগিয়ে নিতেন রয়েল নাসির। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে উত্তর জেলা বিএনপির কয়েকজন নেতার নাম ভাঙ্গিয়ে এ অফিসের কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন তিনি।
বর্তমানে মীরসরাইয়ে বাড়িয়াখালী মাওলানা লকিয়তুল্লা দাখিল মাদরাসা, ফটিকছড়ির দারুস সুন্নাহ কাদেরিয়া দাখিল মাদরাসা, বাকুলিয়া সরকারি কলেজ ভবন নির্মাণের কাজ চলমান আছে তার। এছাড়া লাকী এন্টারপ্রাইজের নামে আরো তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণের কাজ ওয়ার্ক অর্ডার পর্যায়ে রয়েছে। এর বাইরে অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার করে আরো ৩/৪টি কাজ করছেন রয়েল নাসির। মীরসরাইয়ে একটি ভবনের কাজ নিয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অফিসের সাবেক এক নির্বাহী প্রকৌশলীকেও হুমকি দেন তিনি। প্রাণভয়ে ওই প্রকৌশলী অন্যত্র বদলি হয়ে যান। নতুন নির্বাহী প্রকৌশলীকে চাপে রাখতেই সম্প্রতি অফিসে অস্ত্রের মহড়া দেওয়া হয়েছে বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরেও লাকি এন্টারপ্রাইজের অন্তত ১০টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ আমলে দলটির অন্যতম শীর্ষ নেতা ওবায়দুল কাদেরের সুপারিশে চট্টগ্রামে বদলি হয়ে আসা নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার দাশের সহায়তায় এই অফিসও একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন নাসির। পলাশের আত্মীয়দের নামে ‘মেসার্স অরণ্যক’ ও ‘কুল ট্রেডার্স’ নামের দুটি বায়বীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে সেগুলোর নামেও রেট কোড জালিয়াতি করে কৌশলে কাজ বাগিয়ে নিচ্ছেন।
এসব ব্যাপারে নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার দাশ বলেন, ই-জিপির মাধ্যমে সরকারি বিধান মেনে কাজ পাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া অন্য লাইসেন্সের প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে কিন্তু বাস্তবায়ন করতে পারেনি এমন আরো কয়েকটি কাজ সাব কন্ট্রাক্টে করছেন তিনি। রয়েল নাসিরের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি ব্যস্ততার কথা জানিয়ে পরে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
এলজিইডি, শিক্ষা প্রকৌশল ছাড়াও বিএডিসি, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কার্যালয়েও ঠিকাদারি কাজকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার জানান, চট্টগ্রামের ঠিকাদারদের বেশিরভাগই ঘুরেফিরে সবগুলো দপ্তরে কাজ করে থাকে।
তাই সরকারি অফিসে হামলা, নামে-বেনামে অভিযোগ দিয়ে কর্মকর্তাদের হয়রানি কিংবা টাকা বা অন্যান্য সুবিধা দিয়ে ম্যানেজ করার সিদ্ধান্তও একটি জায়গা থেকেই আসে।
সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা জানান, সরকারি অফিসে মব তৈরির পাশাপাশি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগকে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে রয়েল নাসিরের বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যে তার পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার বাসায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীদের একাধিক বৈঠকের ছবি ও ভিডিও এসেছে গোয়েন্দা সংস্থার হাতে। যার একটি কপি আমার দেশের কাছেও সংরক্ষিত আছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (অপারেশন অ্যান্ড ক্রাইম) ফয়সাল আহমেদ বলেন, টেন্ডার-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি কয়েকটি সরকারি দপ্তরে উত্তেজনা ও কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনায় পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। জড়িতদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক রয়েছে।
তবে অভিযুক্ত ঠিকাদার নাসিরউদ্দিন তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন। তিনি জানান, ২০২০ সালের আগে তিনি আওয়ামী লীগ করতেন। এরপর থেকে আর কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত নন। এলজিইডিতে তিনি ঠিকাদারদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলেন, সেটিকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। শিক্ষা প্রকৌশলে তার দুটি এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলে একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। সেখানকার কোনো কর্মকর্তাকে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ সত্য নয়।
তিনি দাবি করেন, ই-জিপি পদ্ধতিতে কোনো নির্বাহী প্রকৌশলীর পক্ষে অনিয়ম করে কাজ দেওয়া সম্ভব নয়। লাকি এন্টারপ্রাইজ সরকারি বিধি মেনেই টেন্ডারে অংশ নেয় এবং যোগ্যতার ভিত্তিতেই কাজ পায়। তিনি আরো বলেন, আমি যে মাপের ঠিকাদার আমার হাতে আরো অনেক বেশি কাজ থাকা উচিত ছিল কিন্তু তা নেই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


হালাল তহবিল ও জাতীয় গভর্ন্যান্স কাঠামো