বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় ও দামে ধস নামায় ধান নিয়ে কৃষকের দুর্দশার যেন শেষ নেই। ধানকাটার যন্ত্র কম্বাইন হারভেস্টারের মালিক ও শ্রমিকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। হারভেস্টারের ভাড়া ও ধানকাটা শ্রমিকের মজুরি অনেক বেশি থাকায় কৃষকের পাকা ধান পানির নিচেই নষ্ট হচ্ছে।
কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি জানান, ঝিনাইদহ কালীগঞ্জে কৃষকের হাসি এখন কান্নায় পরিণত হয়েছে। টানা দুদিনের বৃষ্টি এবং ঝোড়ো বাতাসে ধানক্ষেতে পানি জমেছে। মাঠের পর মাঠ পাকা বোরো ধান মাটিতে শুয়ে পড়েছে। অনেক কৃষকের পাকা ধান জমিতে কেটে রাখার পর ভারী বর্ষণের পানিতে তলিয়ে গেছে। যে কারণে কৃষকরা তাদের ধানের জমিতে গিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন। একবুক স্বপ্ন নিয়ে কৃষকরা বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। অনেকেই ধানকাটা শুরু করেছিলেন কিন্তু শুকাতে ও জমি থেকে তুলতে আনতে পারেননি। আবার অনেক কৃষক ধান কেটে ক্ষেতে রেখে দিয়েছিলেন পরের দিন ঘরে তুলবেন বলে। কিন্তু শুক্রবার ও শনিবার বিকালে প্রবল বৃষ্টি আর ঝড়ে সেসব ধান পানিতে ডুবে গেছে। এমন অবস্থায় চাহিদা মোতাবেক ধানকাটার শ্রমিক না পাওয়ায় ও দ্রুত পানি না সরলে পানির নিচে ডুবে থাকা ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে ঝিনাইদহ জেলায় ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯০ হাজার ২৮০ হেক্টর জমি। তবে তা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে ৯০ হাজার ২৯১ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তিন লাখ ৯৯ হাজার ৮৬ টন চাল। কিন্তু মৌসুমের শেষ সময়ে এসে প্রতিকূল আবহাওয়া কৃষকদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
ঝিনাইদহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কামরুজ্জামান বলেন, এবার ধানের ফলন ভালো হয়েছে। যেসব জমির ধান ৮০ শতাংশ পেকে গেছে, সেগুলো দ্রুত কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বড় কোনো দুর্যোগ না হলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে এমনটা আশা করছেন।
লাখাই (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলায় বোরো ধান কাটার ঠিক আগ মুহূর্তে অসময়ের বন্যা, পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের সারা বছরের খোরাকি সোনালি ফসল। একদিকে ভারী বৃষ্টি আর বন্যার আতঙ্ক, অন্যদিকে ধানকাটার যন্ত্র কম্বাইন হারভেস্টারের মালিকদের সিন্ডিকেটে সাধারণ কৃষক আজ অসহায়। সরকারিভাবে ধানকাটার রেট প্রতি কানি এক হাজার ৭৫০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও যন্ত্র মালিকরা কৃষকদের জিম্মি করে আদায় করছে দুই হাজর ৫০০ থেকে চার হাজর টাকা পর্যন্ত। এলাকায় কৃষক ভিংরাজ মিয়া বলেন, কৃষি কর্মকর্তারা রেট সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু বলছেন না অথবা রেট কার্যকর করতে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। অভিযোগ, খোদ কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের উদাসীনতা ও তদারকির অভাবে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের এ পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে। বন্যায় ও বৃষ্টির আশঙ্কায় যখন দ্রুত ধানকাটার চাপে আছেন, তখন কর্মকর্তারা মাঠে এসে গলাকাটা রেট নিয়ন্ত্রণ করছেন না বলে ভুক্তভোগী কৃষকরা দাবি করেছেন।
হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার কৃষকদের এ বর্তমান পরিস্থিতি সত্যিই উদ্বেগজনক। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মুরাদ ইসলাম স্পষ্ট জানিয়েছেন, এ বছর প্রতি কানি ধান কর্তনের সরকারি হার এক হাজার ৭৫০ টাকা। এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ফারিয়া আলম বলেন, সরকারি রেটের চেয়ে বেশি টাকা নিলে কৃষকদের লিখিত অভিযোগ দিতে হবে। লাখাইয়ের প্রান্তিক চাষিদের অধিকার রক্ষা কেবল দয়া নয়, এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, দেশের উত্তর জনপদের কৃষিপ্রধান জেলা নীলফামারীতে চলতি বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। ইরি ধানের বাজার ধসের কারণে লোকসানে রয়েছে কৃষক। সস্তায় বিকিয়ে দিচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন। সার, সেচ, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের বাড়তি মজুরিতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে ধানের দাম না বাড়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা। ফলে ভবিষ্যতে অনেক কৃষক ধানের পরিবর্তে ভুট্টাসহ অন্যান্য লাভজনক ফসল চাষে ঝুঁকতে পারেন এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে নীলফামারীতে ৮১ হাজার ৮৫৯ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তিন লাখ ৭৪ হাজার ৯০১ টন চাল। ইতোমধ্যে জেলার প্রায় ১৫ শতাংশ ধানকাটা সম্পন্ন হয়েছে।
নীলফামারী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আতিক হাসান বলেন, ‘এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। পোকামাকড়ের আক্রমণ কম থাকায় কীটনাশকের ব্যবহারও তুলনামূলক কম হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যেই জেলার অধিকাংশ ধান কাটা শেষ হবে বলে আশা করছি।’
নীলফামারী কৃষি বিপণন কর্মকর্তা উম্মে কুলসুম বলেন, ‘বর্তমানে বাজারে ধানের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কিছুটা কমে গেছে। তবে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম দ্রুত শুরু হলে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছি। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত দামে ধান ক্রয় কার্যক্রম শুরু হলে বাজারদর স্থিতিশীল হবে। চলতি মৌসুমে জেলায় ৮১ হাজার ৮৫৯ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে। কৃষকদের সহায়তায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৭৮টি কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন কাজ করছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


কালো মানিকের দাম হাঁকা হচ্ছে ২২ লাখ টাকা