মোবাইল ব্যবহারে ঘাড়ের ওপর বাড়তি চাপ

ডা. শেখ সাদীউল ইসলাম

মোবাইল ব্যবহারে ঘাড়ের ওপর বাড়তি চাপ

বর্তমান যুগে মোবাইল ফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজ, যোগাযোগ, শিক্ষা কিংবা বিনোদন—সবকিছুতেই এখন স্মার্টফোনের ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু দীর্ঘসময় মোবাইল ব্যবহারের একটি নীরব ক্ষতিকর দিক হলো ঘাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়া, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘টেক্সট নেক সিনড্রোম’। বিশ্বব্যাপী ঘাড়ব্যথা এখন একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা।

গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ঘাড়ব্যথায় ভোগেন। এছাড়া প্রতিবছর প্রায় ২০–৩০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সক্রিয়ভাবে নেক পেইন বা ঘাড়ব্যথায় আক্রান্ত থাকেন। আধুনিক জীবনযাপন, দীর্ঘসময় মোবাইল ও কম্পিউটার ব্যবহারের কারণে তরুণদের মধ্যেও এ সমস্যা দ্রুত বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

কেন মোবাইল ব্যবহারে ঘাড়ে চাপ বাড়ে

মানুষের মাথার স্বাভাবিক ওজন প্রায় পাঁচ-ছয় কেজি। যখন আমরা মাথা সোজা রেখে সামনে তাকাই, তখন এই ওজন সরাসরি মেরুদণ্ড বহন করে এবং ঘাড়ের ওপর চাপ তুলনামূলক কম থাকে। কিন্তু মাথা সামনের দিকে ঝুঁকলেই ‘মোমেন্ট আর্ম’ বৃদ্ধি পায় এবং ঘাড়ের পেশি ও ডিস্কের ওপর কয়েক গুণ বেশি চাপ পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে—

* ১৫ ডিগ্রি ঝুঁকলে : ঘাড়ে চাপ প্রায় ১২ কেজি

* ৩০ ডিগ্রি ঝুঁকলে : প্রায় ১৮ কেজি

* ৪৫ ডিগ্রি ঝুঁকলে : প্রায় ২২ কেজি

* ৬০ ডিগ্রি ঝুঁকলে : চাপ বেড়ে প্রায় ২৫-২৭ কেজি পর্যন্ত হতে পারে

অর্থাৎ, ছোট একটি মোবাইল স্ক্রিন দেখার জন্য দীর্ঘসময় মাথা নিচু করে থাকলে ঘাড়কে স্বাভাবিকের কয়েক গুণ বেশি ওজন বহন করতে হয়।

ফলে কী কী সমস্যা হতে পারে?

দীর্ঘদিন ভুল ভঙ্গিতে মোবাইল ব্যবহারের ফলে দেখা দিতে পারে—

* ঘাড়ে ব্যথা ও টান টান ভাব

* কাঁধ ও পিঠে ব্যথা

* মাথাব্যথা (টেনশন হেডেক)

* হাত ঝিনঝিন বা অবশ লাগা

* ডিস্ক ডিজেনারেশন (নষ্ট হওয়া) বা প্রলাপ্স

* সারভাইকাল স্পন্ডাইলোসিস

* ঘাড়ের স্বাভাবিক বাঁক নষ্ট হয়ে যাওয়া

* দীর্ঘ মেয়াদে নার্ভে চাপ পড়া

বর্তমানে অনেক তরুণ রোগী অল্প বয়সেই ঘাড়ের ডিস্ক সমস্যা বা সারভাইকাল স্পন্ডাইলোসিস নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন, যার অন্যতম কারণ অতিরিক্ত মোবাইলের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা ও ভুল ভঙ্গি।

কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন

কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চললে এ সমস্যা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব—

* মোবাইল চোখের সমান উচ্চতায় ধরে ব্যবহার করুন

* দীর্ঘসময় মাথা নিচু করে থাকবেন না

* প্রতি ২০-৩০ মিনিট পর ঘাড় সোজা করে বিশ্রাম নিন

* সঠিক ভঙ্গিতে বসুন

* মোবাইলের পর্দায় দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকার অভ্যাস কমানোর চেষ্টা করুন

* নিয়মিত ঘাড় ও কাঁধের ব্যায়াম করুন

* ঘুমানোর সময় খুব উঁচু বালিশ ব্যবহার এড়িয়ে চলুন

সচেতনতাই সমাধান

ঘাড়ের ব্যথাকে অনেকেই সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন অবহেলা করলে এটি স্থায়ী সমস্যায় রূপ নিতে পারে।

আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করব, তবে সঠিক ভঙ্গি বজায় রেখে—এটাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

মনে রাখবেন—

‘মাথার ওজন মাত্র ৫-৬ কেজি, কিন্তু ভুল ভঙ্গিতে সেই চাপ ঘাড়ের ওপর ২৫ কেজিরও বেশি হয়ে যেতে পারে।’

সঠিক ভঙ্গি, সচেতন ব্যবহার ও নিয়মিত ব্যায়ামই পারে আমাদের ঘাড়কে সুস্থ রাখতে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক (স্পাইন সার্জারি)

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর), ঢাকা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন