জুলাই বিপ্লবের শহীদ পরিবার, আহত ব্যক্তি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা সংরক্ষণের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে ‘জুলাই রেকর্ডস’। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে যাত্রা শুরু করা এই সংগঠনটির মূল উদ্দেশ্য আন্দোলনের ইতিহাস, মানুষের আবেগ এবং ত্যাগের গল্পগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দলিল আকারে সংরক্ষণ করা।
জুলাই রেকর্ডসের মূল টিমে রয়েছেন তিনজন। সংগঠনটির চেয়ারম্যান কাজী ওয়ালী উল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক সুলাইম মাহমুদ এবং কোষাধ্যক্ষ সানজিদুল আলম সাগর। ছোট পরিসরে শুরু হলেও তাদের কাজ ইতোমধ্যে ইতিহাস সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয় চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার একজন আহত ব্যক্তির সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে। এরপর ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে শহীদ পরিবারের সদস্য, আহত ব্যক্তি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করতে থাকে। তাদের মতে, আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস কেবল ঘটনার বিবরণে নয়, বরং মানুষের অনুভূতি, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্যেই পাওয়া যায়।
জুলাই রেকর্ডস প্রতি মাসে সাধারণত দুই থেকে তিনটি সফর পরিচালনা করে। এসব সফরে চেয়ারম্যান কাজী ওয়ালী উল্লাহ নিজে অংশ নেন এবং সঙ্গে থাকেন তার সহযোগীরা। তারা অডিও ও ভিডিও উভয় মাধ্যমেই সাক্ষাৎকার ধারণ করেন। অধিকাংশ ভিডিও সাক্ষাৎকার মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ধারণ করা হয়। একটি মোবাইল ফোন ও মাইক্রোফোনই তাদের প্রধান উপকরণ।
সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় তারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে গুরুত্ব দেন। সাক্ষাৎকারদাতার আন্দোলনের আগের জীবন কেমন ছিল, আন্দোলনের পর তার জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে, শহীদ পরিবার ও আহতদের আবেগ-অনুভূতি, আন্দোলনে অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপট এবং ঘটনার সূক্ষ্ম বিবরণ তুলে আনার চেষ্টা করা হয়। এসব কাজ আরো দক্ষভাবে পরিচালনার জন্য দলটি বিশেষ প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় অংশ নিয়েছে এবং নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে থাকে।
এ পর্যন্ত জুলাই রেকর্ডস ২০০টিরও বেশি সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করেছে। এসব সাক্ষাৎকারের মধ্য থেকে ১৭টি বাছাইকৃত সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে ‘জুলাই বয়ান’ শীর্ষক গ্রন্থ। বইটিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের হৃদয়স্পর্শী গল্প, আহতদের বীরত্বগাথা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের মূল্যায়ন স্থান পেয়েছে। ইতোমধ্যে বইটি নিয়ে দুটি অনুষ্ঠানও আয়োজন করেছে সংগঠনটি।
বইটিতে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে শহীদ নূর মোস্তফার গল্প। তিনি আন্দোলনে শহীদ হওয়ার পর তার মরদেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়, অথচ এখনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাননি। শুরু থেকেই তার স্বীকৃতির দাবিতে কাজ করে আসছে জুলাই রেকর্ডস। এছাড়া শ্রমিক শহীদ মোহাম্মদ ফারুকের অবদানের কথাও বইটিতে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে, যার আত্মত্যাগ নিয়ে তুলনামূলকভাবে খুব কম আলোচনা হয়েছে।
জুলাই রেকর্ডসের চেয়ারম্যান কাজী ওয়ালীউল্লাহ বলেন, ‘আগামীতে আরো বই প্রকাশ করবে জুলাই রেকর্ডস। কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা বিশেষ কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে বইগুলো প্রকাশ করা হবে, যাতে মানুষ আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও প্রেরণা সম্পর্কে জানতে পারে।’
সীমিত সম্পদ, অল্পসংখ্যক সদস্য এবং সাধারণ প্রযুক্তি ব্যবহার করেও জুলাই রেকর্ডস যে কাজ করছে, তা বাংলাদেশের গণ-আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণে এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে ও হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আন্দোলনের স্মৃতি ও সত্যকে ধরে রাখতে তাদের এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


শামীম ওসমানসহ ১২ জনের বিচার শুরুর আদেশ