আইসিইউ সুবিধা নেই, তবুও সাপের বিষে মৃত্যুর মুখোমুখি পৌঁছানো এক যুবককে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা। ওঝার অবৈজ্ঞানিক ঝাড়ফুঁকে অবস্থার চরম অবনতি হওয়ার পর সঠিক সময়ে চিকিৎসকদের সাহস ও অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের ফলে অলৌকিকভাবে নতুন জীবন পেয়েছেন ওই যুবক।
সুস্থ হয়ে ওঠা যুবকের নাম সুলাইমান (২৭)। তিনি ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলার লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের বাসিন্দা হাজী সানাউল্লাহর ছেলে।
হাসপাতাল ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টার দিকে কৃষিজমিতে জঙ্গল পরিষ্কার করার সময় সুলাইমানকে একটি বিষাক্ত সাপ কামড় দেয়। ঘটনার পর পরিবারের সদস্যরা তাকে নিকটস্থ হাসপাতালে না নিয়ে স্থানীয় এক ওঝার কাছে নিয়ে যান। ওঝা বিষ ঝাড়ানোর নামে সুলাইমানের শরীরের বিভিন্ন স্থান কেটে রক্ত বের করে ঝাড়ফুঁক দেয়। এতে কিছুক্ষণের মধ্যে সাপের বিষক্রিয়া মারাত্মক আকার ধারণ করে এবং সুলাইমান চেতনা হারিয়ে ফেলেন।
অবস্থার চরম অবনতি হলে ওই দিনই বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সুলাইমানকে চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে আনা হয়।
জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মুনতাসীর মামুন বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. আশরাফুল ইসলাম সুমনকে জানান। পরে তাঁর নির্দেশনায় জুনিয়র কনসালটেন্ট (অ্যানেসথেসিয়া) ডা. মনিরুজ্জামান, মেডিকেল অফিসার ডা. হাসান মাহমুদ এবং আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মাকলুকুর রহমানের সমন্বয়ে দ্রুত একটি জরুরি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়।
মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকরা জানান, প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরের ভোলা জেলা সদর হাসপাতালে রোগীকে স্থানান্তরের মতো শারীরিক অবস্থা বা সময় ছিল না। চরফ্যাশন হাসপাতালে আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকি নিয়ে নিবিড় তত্ত্বাবধানে ‘অ্যান্টিভেনম’ প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকরা। অ্যান্টিভেনম থেরাপির সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে স্বজনদের অবহিত করা হলে তারা চিকিৎসকদের ওপর আস্থা রেখে সম্মতি জানান।
এরপর চিকিৎসকদের টানা পাঁচ ঘণ্টার নিবিড় প্রচেষ্টায় সুলাইমানের চেতনা ফিরে আসে, ঘাড়ের যন্ত্রণা কমে যায় এবং শারীরিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটে। অবস্থা আশঙ্কামুক্ত হলে তাকে হাসপাতালের সাধারণ বেডে দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি পুরোপুরি সুস্থ আছেন।
মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসা সুলাইমান ও তার স্বজনেরা স্বস্তি প্রকাশ করে বলেন, ‘‘ওঝার কাছে নেওয়ার পর অবস্থা যখন আরও খারাপ হচ্ছিল, আমরা ভেবেছিলাম সুলাইমানকে আর বাঁচানো যাবে না। চরফ্যাশন হাসপাতালের ডাক্তারদের অকৃত্রিম চেষ্টা ও সেবায় চিকিৎসকরা তাকে নতুন জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন।’’
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মাকলুকুর রহমান বলেন, ‘‘রোগীর অবস্থা যখন অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ছিল, তখন জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথেই বড় দুর্ঘটনার চরম ঝুঁকি ছিল। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র না থাকা সত্ত্বেও কেবল জীবন বাঁচানোর তাগিদে আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে কাজ করেছি। রোগী সুস্থ হওয়ায় আমাদের চেষ্টা সফল হয়েছে।’’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. আশরাফুল ইসলাম সুমন বলেন, ‘‘চিকিৎসকদের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও মানবিকতার কারণেই রোগীটি জীবন ফিরে পেয়েছে। তবে এ ঘটনা থেকে দুটি বিষয় স্পষ্ট—প্রথমত, সাপে কাটা রোগীকে ওঝার কাছে না নিয়ে সরাসরি হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত, এই দুর্গম অঞ্চলের সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চরফ্যাশন হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ স্থাপনসহ কার্ডিওলজি, পেডিয়াট্রিক্স ও নিউরোলজির মতো বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন করা জরুরি।’’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

