উজিরপুরে মাদক ও কিশোর অপরাধ রোধে আশার আলো ‘রূপায়ণ সাংস্কৃতিক সংঘ’

উজিরপুরে মাদক ও কিশোর অপরাধ রোধে আশার আলো ‘রূপায়ণ সাংস্কৃতিক সংঘ’

মাদক, কিশোর অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধে সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আর সেই লক্ষ্যেই দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করে আসছে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল ইউনিয়নের পূর্ব ধামসর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘রূপায়ণ সাংস্কৃতিক সংঘ’। তবে দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সমস্যা ও তীব্র অর্থসংকটে সংগঠনটির নিয়মিত কার্যক্রম অনেকটাই থমকে আছে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে সংগঠনটি আবারও শিশু-কিশোর ও যুবসমাজকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি মাদকবিরোধী সচেতনতা তৈরিতে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারবে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৫ সালে পূর্ব ধামসর গ্রামের একদল তরুণের উদ্যোগে রূপায়ণ সাংস্কৃতিক সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংগঠনটি মঞ্চনাটক, পথনাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছিল। এমনকি জাতীয় দিবসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানেও তাদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা প্রশংসিত হতো। ১৯৯৯ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন লাভ করে সংগঠনটি (নিবন্ধন নম্বর: বরি-৬০২/৯৯)। তবে একপর্যায়ে সদস্যদের অনেকে চাকরি ও জীবিকার প্রয়োজনে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ায় কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। পাশাপাশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সংগঠনের অবকাঠামোও জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে।

পরবর্তীতে ২০২০ সালে সভাপতি মোহাম্মদ নূরে আলম ও সাধারণ সম্পাদক মো. মাহফুজুর রহমান মাসুম পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাদের উদ্যোগে জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার করে কার্যক্রম চালুর চেষ্টা করা হলেও বর্তমানে কাঠের টিনশেড ঘর ও প্রায় সারা বছর পানিতে নিমজ্জিত মাঠ কার্যক্রম পরিচালনার অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, শিশু-কিশোর ও যুবকদের জন্য খেলাধুলা, নাটক, গান, আবৃত্তি ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানো গেলে তাদের ইতিবাচক ধারায় রাখা সম্ভব। বিশেষ করে মাদক ও কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা অপরিসীম।

শেরেবাংলা ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আনিচুর রহমান বলেন, “সামাজিক অবক্ষয় ও মাদক প্রতিরোধে মানুষের মানসিক বিকাশের জন্য সুস্থ বিনোদনের বিকল্প নেই। রূপায়ণ সাংস্কৃতিক সংঘের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি সহযোগিতায় সচল রাখা জরুরি।”

শিকারপুর বন্দরের জয়শ্রী মণ্ডপাশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ সেকেন্দার বলেন, শিশুদের চিত্তবিনোদনের সুযোগ সীমিত থাকলে তারা ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। সুস্থ সংস্কৃতির সঙ্গে যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করতে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় সক্রিয় করা আবশ্যক।

উজিরপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রকিবুল ইসলাম বলেন, কিশোর ও যুবকদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অত্যন্ত কার্যকর। তরুণদের সুস্থ পরিবেশে ধরে রাখতে নিয়মিত এ ধরনের কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

রূপায়ণ সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি মোহাম্মদ নূরে আলম বলেন, অর্থসংকটের কারণে সংগঠনের অবকাঠামো উন্নয়ন ও নিয়মিত কার্যক্রম চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা পেলে আমরা আবারও পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারব।

সাধারণ সম্পাদক মো. মাহফুজুর রহমান মাসুম জানান, সংগঠনের প্রায় ১৫ শতাংশ জমি রয়েছে। জমি ভরাট করে একটি উপযোগী মাঠ ও ভবন নির্মাণ করা গেলে নিয়মিত সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও সামাজিক কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, দীর্ঘ ৩১ বছর ধরে টিকে থাকা রূপায়ণ সাংস্কৃতিক সংঘের অবকাঠামো উন্নয়ন, মাঠ ভরাট এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পুনরায় চালুর জন্য এগিয়ে আসবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে প্রতিষ্ঠানটি আবারও উজিরপুরের শিশু-কিশোর ও যুবসমাজের সুস্থ বিনোদন, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং মাদকবিরোধী সচেতনতা তৈরির একটি কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন