পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন দিনভর নানা উত্তেজনার পর প্রশাসনের সহযোগিতায় পুলিশ প্রহরায় শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে শনিবার তাকে গার্ড অব অনার দিতে ও দাফনে বাধা দেন স্থানীয় জনতা। একপর্যায়ে স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা তার জন্য খোঁড়া কবর মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলেন। পরে কবর খুঁড়তে কোনো পুরুষ লোক না পাওয়ায় তার বোন ও দুই মেয়ে কবর খনন করেন। দাফন সম্পন্ন হলেও নিজ এলাকায় তার কোনো জানাজা হয়নি বলে জানা গেছে।
লাশ দাফন ও গার্ড অব অনার দিতে বাধার বিষয়ে জামায়াত নেতাদের অভিযোগ, মানিক পশারী একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা; তাই তাকে গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না। শনিবার দুপুরে গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা থাকলেও জামায়াতের বাধায় ওই সময় তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। পাঁচ ঘণ্টা পর গোপনে পিরোজপুর পুলিশ লাইনে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে মানিক পশারীর লাশ নিজ এলাকা পিরোজপুর সদর উপজেলার চিথলিয়া গ্রামে দাফন করতে দেওয়া হবে না বলে স্থানীয় জনগণ বিক্ষোভ করে। বিক্ষুব্ধ জনতা তার জন্য খোঁড়া কবরও ভরাট করে ফেলে। শনিবার রাত সাড়ে ৯টায় পাড়েরহাট বন্দরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে নাসিম সাঈদীর নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়।
মানিক পশারী শনিবার সকালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়েজামাইয়ের বাড়িতে মারা যান। শনিবার দুপুরে তার লাশ গার্ড অব অনারের জন্য পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নেওয়া হলে স্থানীয় লোকজন তাতে বাধা দেন। পরে লাশ পুলিশ প্রহরায় পিরোজপুর পুলিশ লাইনে নিয়ে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। ওই সময় পুলিশ লাইনের সামনে ও আশপাশে জামায়াতের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী জড়ো হন।
মানিক পশারীর পরিবার জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি পলাতক ছিলেন। তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়েজামাইয়ের কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন। গত দুই মাস ধরে অসুস্থতায় ভুগে শনিবার সকালে তিনি মারা যান।
পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফতেখারুল ইসলাম শামীম জানান, মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মানিক পশারীকে পুলিশ লাইনে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। পরে শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে তার উপস্থিতিতে পুলিশ প্রহরায় মানিক পশারীকে তার বাড়িতে কবরস্থ করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বাতেন ও মির্জা জহুরুল হক বলেন, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী রাজাকার ছিলেন না, মানিক পশারীও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। তাদের দাবি, মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করার পর মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধা বানানো হয়েছে।
পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক জানান, মানিক পশারী একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। তাকে কোনোভাবেই গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না। পিরোজপুরের মাটিতে মানিক পশারীর লাশ দাফন করতে দেওয়া হবে না।
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে ও পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী বলেন, মানিক পশারী একজন মিথ্যাবাদী, তিনি তার বাবার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে মিথ্যাচার করেছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিনি সাক্ষ্যে স্পষ্ট বলেছেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেননি। তার দাবি, আত্মগোপনে থাকা পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি তৎকালীন এমপি থাকাবস্থায় সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়েরের পর মানিক পশারীকে ডিও লেটার দিয়ে গেজেটে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম লিখিয়েছেন।
মাসুদ সাঈদী আরও বলেন, গেজেটে যেহেতু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মানিক পশারীর নাম আছে, সেহেতু সরকার তাকে গার্ড অব অনার দিয়েছে। এতে তার কোনো আপত্তি নেই, কারণ সরকার তার দায়িত্ব পালন করেছে। তবে তিনি শুনেছেন, চিথলিয়া গ্রামের বিক্ষুব্ধ জনতা মানিক পশারীকে ওই এলাকায় দাফন করতে দেবে না। জনতা তার জন্য খোঁড়া কবর ভরাট করে দিয়েছে।
মানিক পশারীর মেয়েজামাই ফারুক হোসেন জানান, সকাল ১০টায় তিনি মারা যান। দুপুর ১২টায় তারা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গেলে তিনি গার্ড অব অনারের কথা বলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তাদের দাঁড় করিয়ে রাখেন। একটি সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে কোনো বরফ বা চা-পাতা ছাড়াই পাঁচ ঘণ্টা পর গোপনে কোনোমতে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

