জীবনের দীর্ঘ সংগ্রাম, অভিমানে ভরা হৃদয়বিদারক কিছু কষ্টের কথা ফেসবুকে লিখে না ফেরার দেশে চলে গেলেন পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার তরুণ সাংবাদিক রাকিব হোসেন (৩৫)। কৃষিপণ্যে ব্যবহৃত অত্যন্ত বিষাক্ত অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড সেবনের পর রোববার ভোরে তার মৃত্যু হয়।

মৃত্যুর আগে রাকিব সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে দিয়ে যায় আবেগঘন বিদায়বার্তা। রাকিব হোসেন ছিলেন দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার দশমিনা উপজেলা প্রতিনিধি। পাশাপাশি তিনি দশমিনা বাজারে একটি ফার্মেসি ব্যাবসা পরিচালনা করতেন।
জানা যায়, গলাচিপা উপজেলার চর বিশ্বাস ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মোক্তার হোসেনের মেজো ছেলে রাকিব শৈশব থেকেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন।
২০০১ সালে মায়ের মৃত্যুর পর তিনি ও তার বোন দশমিনায় নানার বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানেই বেড়ে ওঠা, লেখাপড়া এবং পরবর্তীকালে কর্মজীবনের পথচলা।
মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে সকাল ৫টার দিকে নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক হৃদয়স্পর্শী পোস্টে রাকিব লেখেন, একটা মানুষ জীবনে কত যুদ্ধ করতে পারে? যুদ্ধ করতে করতে আজ আমি ক্লান্ত। আপন বলা মানুষগুলো ভালো থাকুক। আফসোস, রক্তের সম্পর্কের মানুষগুলো আমাকে চিনতে পারল না।
পোস্টে তিনি মৃত্যুর পর মায়ের কবরের পাশে শায়িত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ছোট বোন জান্নাতুল ফেরদৌসের কাছে নিজের ব্যাবসায়িক ও আর্থিক বিষয়গুলো বুঝিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে ব্যাবসায়িক অংশীদার গৌতমের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাকে কোনো ধরনের হয়রানি না করার আহ্বানও জানান।
পোস্টের একপর্যায়ে রাকিব লেখেন, ছোটবেলা থেকেই পরিবার ছাড়া বড় হয়েছি। রক্তের মানুষগুলোর কাছ থেকে কখনো কিছু পাইনি, পেয়েছি শুধু অবহেলা। জীবনে যাদের কাছ থেকে ভালোবাসা পেয়েছি, তাদের সঙ্গে আমার কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। আজ বিদায়ের সময় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
সবশেষে সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে তিনি লেখেন, চলার পথে যদি কেউ আমার আচরণে কষ্ট পেয়ে থাকেন, আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। তার এই কথাগুলো এখন স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের হৃদয়ে গভীর বেদনার রেখা এঁকে দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার গভীর রাতে রাকিব চারটি অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড ট্যাবলেট সেবন করেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তিনি তার ছোট বোনকে ফোন করেন। খবর পেয়ে বোন ও কয়েকজন বন্ধু দ্রুত তার ভাড়া বাসায় ছুটে যান। পরে তাকে দশমিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। অ্যাম্বুলেন্স কিছু পথ যাওয়ার পর সকাল ৬টার দিকে তার জীবনপ্রদীপ নিভে যায়।
নিহতের বোন জান্নাতুল ফেরদৌস কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, মা মারা যাওয়ার পর তিনি ও রাকিব নানার বাড়িতে বড় হয়েছেন। ভাইটি সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন, নিজের চেষ্টায় দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে আর ধরে রাখা গেল না।
রোববার দশমিনা মডেল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে অনুষ্ঠিত জানাজায় রাজনৈতিক সহকর্মী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষ অংশ নেন। পরে তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী গলাচিপা উপজেলার নিজ এলাকায় মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
জানাজা শেষে অনেকের চোখেই ছিল অশ্রু। কেউ হারিয়েছেন সহকর্মী, কেউ বন্ধু, কেউ রাজনৈতিক সহযোদ্ধা। আর একজন মা-হারা সন্তানের জীবনের দীর্ঘ অভিমান, কষ্ট আর নীরব যুদ্ধের গল্প শেষ হলো মায়ের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার মধ্য দিয়ে।
দশমিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. রাহুল বিন হালিম জানান, অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড অত্যন্ত বিষাক্ত একটি রাসায়নিক পদার্থ। এর নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক নেই এবং সামান্য পরিমাণ সেবনও প্রাণঘাতী হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলেও রাকিবকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুর রহমান বলেন, বিষাক্ত ওষুধ সেবনের ঘটনায় রাকিব হোসেনের মৃত্যুর খবর পুলিশ পেয়েছে। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়নি। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

