পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় মানিব্যাগ চুরির অপবাদে ১২ বছরের এক এতিম শিশু ও তার বিধবা মাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান চুন্নু ও তার ভাই উপজেলা বিএনপির সদস্য আব্দুল হাই তালুকদারের বিরুদ্ধে।
নির্যাতনের পর মা-ছেলেকে চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তিন দিন বাড়িতে অবরুদ্ধ থাকার পর সোমবার রাতে মা-ছেলে পালিয়ে স্থানীয় এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নেন।
মঙ্গলবার সকালে স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
মঙ্গলবার নির্যাতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। এর আগে গত শুক্রবার রাতে তাদের ওপর ওই নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী শিশুটির নাম জিসান (১২)। সে উপজেলার চাকামইয়া ইউনিয়নের গামুরবুনিয়া গ্রামের মৃত বাচ্চু হাওলাদারের ছেলে এবং তারিকাটা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার মায়ের নাম নাজমা বেগম (৩৫)।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, শুক্রবার রাত ১০টার দিকে হাফিজুর রহমান চুন্নুর ভাই আব্দুল হাই তাদের বাড়িতে গিয়ে জিসানকে ডেকে নিয়ে যান। পরে পাঁচ হাজার টাকা চুরির অভিযোগ তুলে তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তাকে গোয়ালঘরে শিকল দিয়ে বেঁধে আটকে রাখা হয়। ছেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে সেখানে গেলে নাজমা বেগমকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাজমা বেগমের দাবি, ছেলেকে না মারার জন্য অনুরোধ করলেও নির্যাতন বন্ধ করা হয়নি। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে মা-ছেলের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। এরপর তাদের চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে দেওয়া হয়নি। ভয়ে পরবর্তী তিন দিন তারা বাড়ি থেকে বের হতে পারেননি। সোমবার রাতে সুযোগ পেয়ে মা-ছেলে বাড়ি থেকে পালিয়ে স্থানীয় এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরে মঙ্গলবার ভোরে তাদের কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
নাজমা বেগম আরো অভিযোগ করেন, তার স্বামী বাচ্চু হাওলাদার প্রায় দেড় বছর আগে মারা যান। মৃত্যুর আগে জমি বন্ধক রাখার সূত্রে তিনি এক লাখ টাকা দিয়েছিলেন আব্দুল হাইকে। তবে ওই লেনদেনের কোনো লিখিত কাগজ ছিল না।
স্বামীর মৃত্যুর পর পাওনা টাকার লিখিত প্রমাণ চাইলে চুন্নু ও তার ভাই ক্ষুব্ধ হন বলে দাবি নাজমার। তার অভিযোগ, ওই টাকা ও জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরেই তার ছেলেকে চুরির অপবাদ দিয়ে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে।
জিসানের অভিযোগ, মারধরের একপর্যায়ে সে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাকে পেটানো বন্ধ করা হয়নি। এরপর তিন দিন তাকে বাড়ির বাইরে যেতে দেওয়া হয়নি।
কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘মা ও ছেলে দুজনের শরীরেই অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। আঘাতের স্থানে কালচে দাগ হয়েছে। তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান চুন্নু ও তার ভাই আব্দুল হাই তালুকদার বলেন, জিসান তাদের বাড়ি থেকে মানিব্যাগ চুরি করেছে। তাদের ভাষ্য, ছেলেটি এর আগেও চুরি করেছে এবং ‘পেশাদার চোর’ হিসেবে গড়ে উঠছে। এ কারণে তাকে ‘চড়-থাপ্পড়’ দেওয়া হয়েছে।
এক লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল হাই বলেন, ‘তারা টাকা পাবে, তাই তাদের জমি চাষ করতে দিই।’
কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের কোনো বিষয়ে আমাদের জানানো হয়নি। ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এমই
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

