খুঁটিতে বাঁধা বাবাকে চা-রুটি খাওয়ানো সেই শিশুর পড়াশোনার দায়িত্ব নিল প্রশাসন

খুঁটিতে বাঁধা বাবাকে চা-রুটি খাওয়ানো সেই শিশুর পড়াশোনার দায়িত্ব নিল প্রশাসন

চুরির অভিযোগে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় বাবাকে চা-রুটি খাইয়ে দেওয়া ৯ বছরের শিশুকন্যার হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মানবিক উদ্যোগ নিয়েছে বরিশালের উজিরপুর উপজেলা প্রশাসন। মাদকাসক্তির অভিযোগ থাকা ওই বাবা অনিককে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আলী সুজা। একই সঙ্গে শিশুটির লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

রোববার দুপুর ১২টার দিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উজিরপুর উপজেলার বামরাইল এলাকার নিজ বাড়ি থেকে অনিককে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে যান। এ সময় বামরাইল ইউনিয়নের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সচেতন নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

এর আগে শনিবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী সুজা অনিকের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং মানবিক সহায়তা প্রদান করেন। পরে অনিককে চিকিৎসার আওতায় আনতে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানোর উদ্যোগ নেন তিনি।

ঘটনার সূত্রপাত গত ২৬ সেপ্টেম্বর ভোরে। বামরাইল বাজারে চুরির অভিযোগে স্থানীয় কয়েকজন অনিককে আটক করে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন বলে জানা যায়। এ সময় খবর পেয়ে সেখানে ছুটে আসে তার ৯ বছরের শিশুকন্যা। বাবাকে মারধর না করার জন্য কান্নাকাটি করে অনুরোধ করতে থাকে সে।

একপর্যায়ে বাবার জন্য চা ও রুটি নিয়ে আসে শিশুটি। চায়ের মধ্যে রুটি ভিজিয়ে বাবার মুখে তুলে দিতে থাকে। বাবার শরীরের ব্যথার জায়গায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সে জানতে চায়, ‘বেশি ব্যথা পাইছো বাবা?’ শিশুটির এমন দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনিকের বিরুদ্ধে এর আগেও চুরির অভিযোগ উঠেছিল এবং স্থানীয়ভাবে কয়েকটি ঘটনা মীমাংসা করা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিস্তারিত স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় থানায় কোনো লিখিত অভিযোগও করা হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে।

উজিরপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রকিবুল ইসলাম জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও দেখে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। পরে স্থানীয়রা বিষয়টি নিজেদের মধ্যে মীমাংসা করে নেন। এ ঘটনায় কেউ থানায় অভিযোগ করেননি।

এদিকে শিশুটির বাবাকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানোর পাশাপাশি তার ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবছে উপজেলা প্রশাসন। শিশুটির লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাবাকে রুটি খাওয়ানোর দৃশ্য দেখে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান শিশুটিকে শিক্ষাসহায়তা ও আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন বলে স্থানীয়ভাবে জানানো হয়েছে।

চুরির অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা—সেটি আইনগত প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হওয়ার বিষয়। তবে অভিযোগের বিচার নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে প্রকাশ্যে মারধর করা এবং শিশুর সামনে এমন ঘটনা ঘটানো যে কতটা নির্মম প্রভাব ফেলতে পারে, বামরাইলের এই ঘটনা সেই প্রশ্নটিই সামনে এনেছে।

একই সঙ্গে বাবার প্রতি ৯ বছরের শিশুটির নিঃশর্ত ভালোবাসার দৃশ্যটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও ছোট্ট মেয়েটির ‘বাবা’ ডাক যেন মনে করিয়ে দিয়েছে—অভিযোগের আড়ালেও একজন মানুষ, একটি পরিবার এবং একটি শিশুর ভবিষ্যৎ থাকে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন