মধ্যরাত থেকে ইলিশ ধরার ওপর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, ঘাটে ফিরছেন উপকূলের জেলেরা

মধ্যরাত থেকে ইলিশ ধরার ওপর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, ঘাটে ফিরছেন উপকূলের জেলেরা

মা ইলিশের নির্বিঘ্ন প্রজনন নিশ্চিত করতে সাগর ও নদীতে ইলিশ আহরণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার সময় ঘনিয়ে আসায় গভীর সাগর থেকে পটুয়াখালীর মহিপুর ও আলীপুর মৎস্যবন্দরে ফিরতে শুরু করেছেন উপকূলের জেলেরা।

বিজ্ঞাপন

বুধবার দিবাগত মধ্যরাত থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার খবরে গভীর সাগর থেকে একে একে ঘাটে ফিরছে মাছ ধরার ট্রলার। ব্যস্ত মৎস্যবন্দরে এখন কেউ শেষ মুহূর্তে মাছ বিক্রি করছেন, আবার কেউ ট্রলার ও জাল গুছিয়ে নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে ঘাটে এক ধরনের কর্মচাঞ্চল্য বিরাজ করছে। তবে জেলেদের পাশাপাশি আড়তদার, মাছ ব্যবসায়ী, শ্রমিক, বরফকল ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিন নদী ও সাগরে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত এবং কেনাবেচা নিষিদ্ধ থাকবে। এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

জেলেদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা নিয়ে জেলেদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেক জেলের দাবি, এখনো অধিকাংশ ইলিশের পেটে ডিম আসেনি। মৌসুমের শুরুতে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে তাদের তীরে ফিরতে হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, নিষেধাজ্ঞার এই ২২ দিন পরিবার-পরিবার নিয়ে সংসার চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

মহিপুর মৎস্যবন্দরের জেলে আব্দুল জলিল বলেন, ‘মাছ ধরা বন্ধ মানেই আমাদের আয় বন্ধ। সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা, ট্রলার ও জালের ঋণ—সবকিছুই মাছ ধরার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। নিষেধাজ্ঞার এই সময় কর্মহীন থাকাটা আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর।’

আলীপুরের জেলে লাল মিয়ার দাবি, অধিকাংশ ইলিশের পেটে এখনো ডিম আসেনি। আরো ১০ থেকে ১৫ দিন পর ডিম আসার উপযুক্ত সময় হতে পারে। তিনি বলেন, ‘মৌসুমের শুরুতে মাছ পাইনি। শেষের দিকে কিছুটা মাছ পাওয়া শুরু করেছিলাম, এখন আবার নিষেধাজ্ঞা শুরু হলো। আমরা ধারদেনার মধ্যে আছি। এভাবে চলতে থাকলে জেলে পেশায় টিকে থাকা কঠিন হবে।’

আরেক জেলে শাহ আলম জানান, ইলিশের পেটে ডিম আসুক বা না আসুক, সরকারের নিষেধাজ্ঞা তারা মেনে চলবেন। তবে ২২ দিনের জন্য পরিবারপ্রতি মাত্র ২৫ কেজি চাল যথেষ্ট নয়। সরকারি সহায়তার পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃত জেলেদের তালিকা যাচাই করে তাদের হাতে চাল পৌঁছানোর দাবি জানান তিনি।

এ ছাড়া জেলেদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন দেশের জলসীমায় পার্শ্ববর্তী দেশের জেলেদের অনুপ্রবেশ কঠোরভাবে ঠেকাতে হবে। তাদের অভিযোগ, দেশীয় জেলেরা যখন মাছ ধরা থেকে বিরত থাকেন, তখন বিদেশি জেলেরা বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে অবাধে ইলিশ শিকার করলে এই নিষেধাজ্ঞার সুফল ব্যাহত হবে।

প্রশাসনের প্রস্তুতি

কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী বলেন, ‘মা ইলিশ রক্ষায় উপজেলার বিভিন্ন বাজারে মাইকিং, ব্যানার ও লিফলেটের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে উপজেলা প্রশাসন, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ ও থানা পুলিশ যৌথভাবে নদী ও সাগরে নজরদারি চালাবে।’

পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী জানান, ‘জেলায় প্রায় ৭৯ হাজার নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে প্রত্যেক জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার সরকারি ব্যবস্থা রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা শতভাগ সফল করতে জনসচেতনতামূলক প্রচারের পাশাপাশি নদী ও সাগরে কঠোর নজরদারি থাকবে।’

মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, এই ২২ দিন মা ইলিশকে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিলে ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বহুগুণ বাড়বে। নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেদের জালে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়বে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সকলের।

এমই

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন