পটুয়াখালীর লতিফ মিউনিসিপ্যাল সেমিনারি স্কুলের বিরুদ্ধে যেন অভিযোগের শেষ নেই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ের ফ্যাসিবাদী সরকারের দোসররা বিএনপি নেতাদের কাঁধে ভর করে এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। শুধু তাই নয়, বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে একটি পক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে রাখছেন এসব আওয়ামী দোসরদের। ফলে এখনো স্কুলটিতে বিএনপিপন্থি শিক্ষক-কর্মচারীদের ওপর ভয়ভীতিসহ নানা ধরনের হয়রানি অব্যাহত রয়েছে।
জেলা বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ আওয়ামী ঘরানার শিক্ষকদের পক্ষ নিয়ে নিজ প্রতিষ্ঠানেই কোণঠাসা করে রাখছেন বিএনপি ঘরানার শিক্ষকদের। এমনকি বিএনপির এসব নেতার কারণেই বিদ্যালয়টিকে জাতীয়করণের মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মজিবুর রহমান ও সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন সেলিমের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, তারা প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে ১৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
সূত্র জানায়, বিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মজিবুর রহমান নিষিদ্ধ ঘোষিত দশমিনা উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং অলীপুরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি ছিলেন। এছাড়া সাবেক প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন পটুয়াখালী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের সময় ২০১৯ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের নামে ২০ লাখের অধিক টাকা শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে উত্তোলন করে তা প্রায় পুরোটাই আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মজিবুর রহমান ও সাবেক প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন সেলিমের বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগের পর টাকা উত্তোলন ও আত্মসাতের প্রমাণ মেলায় গত ২৫ জুন ১০ কার্যদিবসের মধ্যে টাকা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের শিক্ষা ও কল্যাণ শাখার সহকারী কমিশনার শারমিন সুলতানা। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই টাকা পরিশোধ করেননি অভিযুক্তরা। অভিযোগ রয়েছে, জেলা বিএনপির সভাপতি স্নেহাংশু সরকার কুট্টি অভিযুক্ত শিক্ষকদের পক্ষ নেওয়ায় টাকা পরিশোধ না করেই পার পেয়ে যাচ্ছেন ওই দুই শিক্ষক।
সূত্র আরো জানায়, সাবেক প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মজিবুর রহমানের অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গত ৫ এপ্রিল বিদ্যালয়ের ক্ষতিগ্রস্ত ১১ শিক্ষক-কর্মচারী পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক বরাবর একটি আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার তামিম নূর ইসলামকে নির্দেশ দেওয়া হয়। বিষয়টি তদন্ত শেষে অভিযুক্ত দুই শিক্ষকের লেনদেনকে ‘অবৈধ’ হিসেবে উল্লেখ করে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে ১৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা ভুক্তভোগীদের কাছে ফেরতের নির্দেশ দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসনের তদন্তের নথিতে বলা হয়েছে, অভিযোগের সার্বিক পর্যালোচনায় জাতীয়করণের জন্য টাকা গ্রহণের বিষয়ে সত্যতা পাওয়া গেছে। তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, লতিফ মিউনিসিপ্যাল সেমিনারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক স্কুল জাতীয়করণের প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে ১৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। তাদের দাবি অনুযায়ী বিভিন্ন খাতে ১৪ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু এসব ব্যয়ের বিপরীতে কোনো ভাউচার দিতে পারেনি তারা।
বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকের অভিযোগ, শেখ হাসিনার সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিএনপিপন্থি শিক্ষক-কর্মচারীদের হয়রানি করা হতো। তাদের দাবি, সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট বিদ্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করতেন এবং অনিয়মের প্রতিবাদকারীদের হুমকি, শোকজ ও বরখাস্তসহ নানা হয়রানির শিকার হতে হতো।
শিক্ষকদের অভিযোগ, মজিবুর রহমান, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মঞ্জুরুল আহসানসহ চার থেকে পাঁচজনের ওই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এসএসসি পরীক্ষায় নকলের অভিযোগ, শিক্ষকদের ন্যায্য বিল আটকে রাখা, ইচ্ছামতো ক্লাস রুটিন তৈরি এবং নতুন কারিকুলাম অনুযায়ী বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের রুটিনে অন্তর্ভুক্ত না করাসহ দীর্ঘদিনের নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পরও বিদ্যালয়ের ক্ষমতার কাঠামোর কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মজিবুর রহমান দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম এবং বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের ওপর স্টিম রোলার চালিয়েও বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষক, কর্মচারী ও অভিভাবকরা জানান, জেলা বিএনপির একাংশের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে অভিযুক্তরা পার পেয়ে যাচ্ছেন। তারা আরো জানান, রাজনৈতিক আশ্রয়ের কারণেই জেলা প্রশাসনের তদন্তে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে টাকা ফেরতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও, ২৪-এর আন্দোলনে ফ্যাসিস্টদের দোসর হিসেবে অভিযুক্ত এই দুই আওয়ামীপন্থি শিক্ষক কীভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্বে বহাল থাকলেনÑএমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সবার মধ্যে।
এ বিষয়ে লতিফ মিউনিসিপ্যাল সেমিনারি স্কুলের শিক্ষক মো. নুরুজ্জামান আমার দেশকে জানান, সাবেক ও বর্তমানÑদুই প্রধান শিক্ষক আওয়ামী লীগের পোস্টধারী নেতা। বিগত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় উল্লেখিত দুই শিক্ষকের মাধ্যমে নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন তিনি। কেবলমাত্র বিএনপির সমর্থক হওয়ার কারণে তার ওপর অনেক নির্যাতন ও হয়রানি করেছেন উল্লেখিত দুই শিক্ষক। জাতীয়করণের নামে অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্নভাবে বিদ্যালয়ের অর্থ নয়ছয় করেছেন তারা। ২৪-এর পটপরিবর্তনের পর তারা বিএনপির কতিপয় নেতার ছত্রছায়ায় রয়েছেন। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এমনকি জেলা প্রশাসনও অসহায়।
বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি (বাকশিস) পটুয়াখালী জেলার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ফারুক হোসেন বলেন, ‘লতিফ মিউনিসিপ্যাল সেমিনারিতে জাকির, মজিবুরের দুর্নীতির কথা জানে না জেলায় এমন কোনো শিক্ষক নেই। জাতীয়করণের মতো একটি রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার বিষয়কে ব্যবহার করে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন, এটি শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে এটি চরম দুর্নীতি।’ অবিলম্বে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মজিবুরকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে বিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সাবেক প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন বলেন, কাগজে-কলমে আওয়ামী লীগে থাকলেও তিনি সক্রিয় ছিলেন না। তিনি কোনো অর্থ আত্মসাৎ করেননি কিংবা বিএনপিমনা শিক্ষকদের হয়রানি করেননি। জেলা প্রশাসক যে তদন্ত করে ১৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা জমা দিতে বলেছিলেন তা নতুন করে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকার কথা অস্বীকার করেন। বিএনপির জিয়া গবেষণা পরিষদের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য দাবি করে তিনি বলেন, আমি দুর্নীতি করেছি কি না, কোনো শিক্ষককে হয়রানি কিংবা নির্যাতন করেছি কি না তা দেখার দায়িত্ব আপনার নয়। অনেকেই আমার বিরুদ্ধে লিখেছে, আপনি যা পারেন লেখেন, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। জেলা বিএনপির নেতারা আছেন, জেলা প্রশাসক আছেন আমি টাকা আত্মসাৎ করলে তারা দেখবেন। আওয়ামী ঘরানার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ অন্য অভিযুক্তদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক স্নেহাংসু সরকার কুট্টি বলেন, আপনি যেসব প্রশ্ন করেছেন তা সত্য নয়। এখানে এসে যাচাই-বাছাই করুন। প্রধান শিক্ষককে ১৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ প্রসঙ্গে বলেন, এ বিষয়ে এখনো তদন্ত হচ্ছে। বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের জন্য সবাই টাকা দিয়েছিল, কিন্তু জাতীয়করণ না হওয়ায় এখন অভিযোগ করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আসহান হাবিব আমার দেশকে বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

