ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার এওয়াজপুর অজুফিয়া আলিম মাদ্রাসার সহ-সুপার মো. ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে চাকরি থেকে পদত্যাগ করার প্রায় এক বছর পর পুনরায় প্রতিষ্ঠানে ফেরার চেষ্টা ও সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলনের তদবির করার অভিযোগ উঠেছে। মাদ্রাসার শিক্ষক হাজিরা খাতা এবং ক্লাস রুটিন বিশ্লেষণ করে এই অভিযোগের তথ্য মিলেছে।
নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে মো. ইকবাল হোসেন ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট চাকরি থেকে অব্যাহতির আবেদন করেন। পরবর্তী সময়ে মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান ও সভাপতি মোহাম্মদ শরীফ হোসেনের স্বাক্ষরে তার ইনডেক্স বাতিলের (ডিলিট) আবেদন মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়। পদত্যাগের আবেদন ও ইনডেক্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি আর প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নেননি।
মাদ্রাসার প্রশাসনিক নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, শিক্ষকদের হাজিরা খাতায় ইকবাল হোসেনের নামের পাশে ‘ইস্তফা’ লেখা রয়েছে। এ ছাড়া ঘটনার পরবর্তী সময়ের ক্লাস রুটিনেও তার নাম রাখা হয়নি। দায়িত্ব পালন না করা এবং ক্লাস রুটিনে নাম না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি পুনরায় প্রতিষ্ঠানে ফেরার চেষ্টা করছেন ও বেতন-ভাতা উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে শিক্ষক ও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক (আরবি) মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, সহ-সুপার পদত্যাগ করার পর থেকে আমাদের হাজিরা খাতায় তার নামের স্থানে 'ইস্তফা' লেখা রয়েছে। একই সঙ্গে ক্লাস রুটিনেও তার কোনো নাম নেই।
এদিকে, মো. ইকবাল হোসেনের মূল নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিনের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের নিয়োগসংক্রান্ত রেজুলেশনে অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য ও শিক্ষক প্রতিনিধিদের জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করে ওই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া চালানো হয়। তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত সহ-সুপারকে নিয়োগসংক্রান্ত মূল নথিপত্রসহ হাজির হতে বলা হলেও তিনি তা দেখাতে ব্যর্থ হন। এ ছাড়া মাদ্রাসা কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট নথিপত্রেও তার নিয়োগের প্রয়োজনীয় মূল কাগজপত্র পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পদত্যাগকৃত সহ-সুপার মো. ইকবাল হোসেন বলেন, আমি নিজের ইচ্ছায় পদত্যাগ করিনি। অসুস্থ থাকা অবস্থায় প্রতিষ্ঠান প্রধান ও দাতা সদস্য ছালাম জমাদার আমাকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করেছেন।
তবে জোরপূর্বক পদত্যাগের অভিযোগ অস্বীকার করে মাদ্রাসার সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ মীর শরীফ হোসেন বলেন, সহ-সুপার মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন নিজে পদত্যাগ করেছেন। তার পদত্যাগের আবেদনটি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। পাশাপাশি এমপিওভুক্ত তালিকা থেকে তার নাম কর্তনের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনও পাঠানো হয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে উপজেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, একটি পক্ষ ওই সহ-সুপারের বেতন অনুমোদন করানোর জন্য জোর তদবির চালাচ্ছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার বেতন অনুমোদন হয়নি।
এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ এবং পদত্যাগের পর পুনরায় প্রতিষ্ঠানে ফেরার চেষ্টার বিষয়টি সমন্বিতভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। দায়িত্ব পালন না করে কোনো সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি নথিপত্র যাচাই করে তার নিয়োগের বৈধতা, পদত্যাগের কার্যকারিতা এবং ইনডেক্সের বর্তমান অবস্থা পরিষ্কার করার জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু পদক্ষেপ দাবি করেছেন তারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

