নদীভাঙনে দীর্ঘ হচ্ছে নিঃস্ব মানুষের সারি

নদীভাঙনে দীর্ঘ হচ্ছে নিঃস্ব মানুষের সারি
নড়াইলের লোহাগড়ার মধুমতী নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি। ছবি সম্প্রতি তোলা। আমার দেশ

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে পায়রা নদী, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পদ্মা ও নড়াইলে মধুমতী ও নবগঙ্গা নদীর ভাঙনে দীর্ঘ হচ্ছে নিঃস্ব মানুষের সারি । বিলীন হয়ে যাচ্ছে কৃষিজমিসহ নানা প্রতিষ্ঠান। ভাঙন রোধে উদ্যোগ নেই ।

নড়াইল থেকে খায়রুল আরেফিন রানা জানান, নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার আমডাঙ্গা ও শিকারপুর গ্রামজুড়ে মধুমতী নদীর ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এখানকার অন্তত তিন কিলোমিটারব্যাপী ভাঙনে নিঃস্ব মানুষের সারি দীর্ঘ হচ্ছে। এ দিকে নবগঙ্গার ভাঙনের কবলে হুমকির মুখে পড়েছে কয়েকশ বছরের পুরোনো বড়দিয়া বাজার।

বিজ্ঞাপন

নদীভাঙনের শিকার কয়েকজন গ্রামবাসী জানান, বর্ষা এলেই খরস্রোতা হয়ে ওঠে মধুমতী, বৃদ্ধি পায় ভাঙনের তীব্রতা। বিগত ১ দশকের ক্রমাগত ভাঙনে শত শত একর ফসলি জমি, অসংখ্য বসতবাড়ি, স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। হতদরিদ্র এ জনপদের অধিকাংশ মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। বিগত প্রায় দুই মাসব্যাপী অব্যাহত ভাঙন সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ । ভাঙনের তীব্রতা বাড়লে প্রতি বছরই পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন রোধের চেষ্টা করে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার সাহা বলেন, সময়ের পরিক্রমায় নদীর ভাঙাগড়ার খেলায় মধুমতীর মূল ধারা বালুচরে রূপান্তরিত হয়ে আমডাঙ্গা শিকারপুর গ্রাম স্থানান্তরিত হয়ে বসতি গড়ে ওঠে, নদী তার আদি গতি পথে ফেরায় এবং বিগত কয়েক বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে নদীর পানির আধিক্যে এবং তীব্র তোড়ে সংলগ্ন এলাকার ভাঙন তীব্র হয়েছে। এছাড়া তিনি নদীভাঙনের জন্য বালু উত্তোলনও অনেকাংশে দায়ী জানিয়েছেন তিনি । আমডাঙ্গা এলাকায় ভাঙনরোধে ১ হাজার ৭০০ মিটার স্থায়ী তীররক্ষা প্রকল্প প্রণয়নে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে এবং বড়দিয়া বাজাররক্ষায় ১৫০মিটার অস্থায়ী, ১৭০মিটার স্থায়ী তীররক্ষা প্রকল্প গ্রহণে প্রস্তাবনা প্রেরণের প্রস্তুতি চলছে।

মির্জাগঞ্জ (পটুয়াখালী) থেকে শামসুল হক জানান, পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে পায়রা নদীর তীব্র ভাঙনে ছোট হয়ে আসছে উপজেলার মানচিত্র। বিগত পাঁচ বছরে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে শত শত ঘরবাড়ি। অন্যত্র সরিয়ে নিতে হচ্ছে কমপক্ষে ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পাঁচটি গ্রামের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। ভেঙে গেছে কয়েকশ একর কৃষিজমি। জানা গেছে, গত কয়েক মাসে উপজেলার মাধবখালী ইউনিয়নের রামপুর ও মির্জাগঞ্জ ইউনিয়নের পিপঁড়াখালী গ্রামে কমপক্ষে শতাধিক বসতঘর ও দুটি জামে মসজিদসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এ ভাঙন ঠেকাতে না পারলে আরো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন গ্রামবাসী।

মাধবখালী ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক হাওলাদার আমার দেশকে বলেন, ‘পায়রা নদীর গ্রাসে আমার বাড়িঘর তিনবার ভাইঙা গেছে।’

পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমরান হোসেন আমার দেশকে বলেন, পায়রা নদী ভাঙন রোধে ২০২৭ সালে একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। এরপর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) বাস্তবায়নের বাজেট বরাদ্দ পাওয়া গেলে সিসি ব্লকের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।

ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া) থেকে তামজিদ হোসেন তামিম জানান, একসময় যে জমিতে সবুজ পানপাতায় ভরে থাকত বরজ, সেই জমি এখন পদ্মার পেটে। কারো কয়েক বিঘা জমি, কারো সাজানো পানবরজ সবই কেড়ে নিয়েছে নদী। নিঃস্ব হয়ে অনেকেরই দিন কাটাচ্ছেন অনিশ্চয়তায়, কেউবা জীবিকার তাগিদে ছেড়ে যাচ্ছেন ভিটামাটি। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে এভাবেই সর্বস্ব হারাচ্ছেন শত শত কৃষক। গত দুই মাসে নদীতে বিলীন হয়েছে প্রায় ২০০ একর ফসলি জমি। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলমান এ ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পানচাষিরা। হুমকির মুখে পড়েছে এলাকার ঐতিহ্যবাহী কুচিয়ামোড়া পানবাজারও। জমির পাশাপাশি পানবরজ হারিয়ে কয়েকশ কৃষক এখন দিশাহারা।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাহমুদা সুলতানা জানান, ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত দুই ইউনিয়নের প্রায় ৩২০ জন কৃষকের তালিকা তৈরি করে জেলায় পাঠানো হয়েছে। তাদের সহায়তার বিষয়ে ব্যবস্থা করা করা হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদদৌলা বলেন, আমি ইতোমধ্যে এলাকায় সরেজমিনে দেখেছি। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার জুড়ে ভাঙন হচ্ছে। এর মধ্যে তিন কিলোমিটার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। জরুরি ব্যবস্থা নিয়ে ভাঙন রোধ সম্ভব নয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন