বরিশাল ডিসির বিরুদ্ধে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

নিকুঞ্জ বালা পলাশ, বরিশাল

বরিশাল ডিসির বিরুদ্ধে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে বরিশালে বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে বরিশালের জেলা প্রশাসক (ডিসি) খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে। অতিরিক্ত ভোটকক্ষ ও দুর্গম কেন্দ্র দেখানো থেকে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে বিভিন্ন খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে প্রশাসনের ভেতরেই চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাংশের দাবি, কোটি টাকার এই অনিয়ম ঢাকতে চাপ ও বদলির মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।

বরিশাল ডিসির বিরুদ্ধে হিজলা, মুলাদী ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় অতিরিক্ত অস্থায়ী ভোটকক্ষ এবং দুর্গম ভোটকেন্দ্র দেখিয়ে সাড়ে ৬২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের বরাদ্দকৃত অর্থ বিভিন্ন খাতে ব্যয় না করে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে তা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এমনকি ওই অর্থ সমন্বয়ের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিল-ভাউচার সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে বরিশাল জেলা রিটার্নিং অফিসের অধীনে নির্বাচন পরিচালনার জন্য মোট ১৩ কোটি ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ভোটকেন্দ্র পরিচালনা, সরঞ্জাম পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে নির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেই অর্থ ব্যয় করা হয়নি।

সরকারি নথি অনুযায়ী বরিশালের ১০ উপজেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনের জন্য মোট ৮৩৩ ভোটকেন্দ্র এবং ৫ হাজার ১৯৭ ভোটকক্ষ দেখানো হয়। এর মধ্যে ৭৭৭টি অস্থায়ী কক্ষ, ১৯৫টি দুর্গম ভোটকেন্দ্র এবং ১ হাজার ৮৯৩টি দুর্গম কক্ষ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে বিভিন্ন উপজেলা নির্বাচন অফিসের নথিতে এসব সংখ্যায় অসামঞ্জস্য দেখা গেছে।

মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় প্রথমে দুর্গম ভোটকেন্দ্র ১০০ উল্লেখ থাকলেও পরে তা সংশোধন করে ৫৫টি করা হয়। একই নথিতে দুর্গম ভোটকক্ষ ৬৩২ উল্লেখ রয়েছে। মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসার সাইদুর রহমানের ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে স্বাক্ষরিত স্মারকে বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। মুলাদী উপজেলা নির্বাচন অফিসার নাজিম উদ্দিন গত ২৩ ডিসেম্বর পাঠানো এক চিঠিতে মুলাদী উপজেলায় ৭২টি দুর্গম ভোটকেন্দ্রের কথা উল্লেখ করলেও পরে তা কেটে ৩৯টি করেছেন এবং ভোটকক্ষের সংখ্যা দেখিয়েছেন ৪৩৭টি।

হিজলা উপজেলা নির্বাচন অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) তানজিলা ছারিন ইসলাম নাদিয়া গত ২৪ ডিসেম্বর এক চিঠিতে দুর্গম ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৪৯ উল্লেখ করলেও পরে তা কেটে ২৩টি করেছেন। এ উপজেলায় দুর্গম ভোটকক্ষের সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৩১৮টি। একই পরিস্থিতি অন্যান্য উপজেলায়ও। হিজলা, মুলাদী ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় দুর্গম ভোটকেন্দ্র ও দুর্গম ভোটকক্ষের সংখ্যা বেশি দেখিয়ে বরিশালের ডিসি খায়রুল আলম সুমন সাড়ে ৬২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সূত্রের দাবি, মুলাদী, মেহেন্দিগঞ্জ, হিজলা উপজেলায় দুর্গম ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষের বরাদ্দকৃত অর্থ এখনো সহকারী রিটার্নিং অফিসার এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের হাতে না পৌঁছালেও তাদের বিল-ভাউচার জমা দিতে বলা হচ্ছে। অথচ ওই অর্থ অ্যাকাউন্ট থেকে উত্তোলন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অভ্যন্তরীণ আলোচনা এখন তুঙ্গে।

সূত্রমতে, অতিরিক্ত ভোটকেন্দ্র, ভোটকক্ষ এবং দুর্গম এলাকার ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষ দেখিয়ে এ তিনটি উপজেলার জন্য অতিরিক্ত ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বেশি বরাদ্দ আনা হয়। নির্বাচন কমিশন থেকে আসা ১৩ কোটি ১১ লাখ টাকা প্রকৃত ভোটকেন্দ্র ও কক্ষ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ১০ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে চেকের মাধ্যমে টাকা পাঠানো হয়। কিন্তু প্রকৃত তালিকার বাইরে অতিরিক্ত ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষ দেখানো তালিকা মোতাবেক ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা উদ্বৃত্ত থাকে ডিসির তহবিলে। ওই টাকা বৈধ করতে তিনি হিজলা, মুলাদী ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে নির্ধারিত টাকার বিল-ভাউচারের সঙ্গে সমন্বয় করে অতিরিক্ত ভাউচার পাঠানোর মৌখিক নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট তিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সে নির্দেশ মেনে অতিরিক্ত বিল পাঠিয়ে দেন। কিন্তু সে টাকা কাউকে না দিয়ে জেলা প্রশাসক নিজেই তা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, গত ৩০ ডিসেম্বর আচরণবিধি লংঘন ও নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় নিয়োজিত ২০ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য নির্বাচন কমিশন থেকে সাড়ে ৫৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রত্যেকের জন্য আপ্যায়ন বাবদ ৯০ হাজার টাকা, পিএল ব্যয় বাবদ এক লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে থাকা নাজির, পেশকার ও অফিস সহায়কদের জন্য জনপ্রতি সাড়ে ২২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু উল্লিখিত বরাদ্দের অর্থ ম্যাজিস্ট্রেটসহ সংশ্লিষ্টদের না দিয়ে তা আত্মসাতের চেষ্টা করেন ডিসি খায়রুল আলম সুমন।

নির্বাচনি মাঠে দায়িত্ব পালন করার এক মাস পরও পারিশ্রমিক না পেয়ে অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কয়েকজনের বাগ্‌বিতণ্ডা হলে তাদের প্রাপ্য প্রায় তিন লাখ টাকার পরিবর্তে ৮০ বা ৯০ হাজার টাকা করে দিয়ে বাকি অর্থ বিভিন্ন ভাউচার দেখিয়ে নিজেই তা আত্মসাৎ করেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ব্যাকডেটে ভাউচারে সই করার জন্য চাপ দিলেও কেউই তা করেননি বলে জানা গেছে। বিষয়টি ভালোভাবে নেননি ডিসি খায়রুল আলম। এর জেরে তিনি এডিসি (রেভিনিউ) ওবায়েদুর রহমান, সিনিয়র ম্যাজিস্ট্রেট সমাপ্তি রায়সহ সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটদের তার (ডিসি) কক্ষে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেন।

এছাড়া যেসব কর্মকর্তা ব্যয়-সংক্রান্ত তথ্য বা অনিয়ম সম্পর্কে অবগত ছিলেন, তাদের বিভিন্ন শাখায় বদলি করা হয়েছে। নির্বাচনের সময়কার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা রঞ্জন কুমার হালদারকে সাধারণ শাখা থেকে সরিয়ে জুডিশিয়াল মুন্সিখানা শাখায়, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) লুজি কান্ত হাজিংকে মানবসম্পদ ও উন্নয়ন শাখায় বদলি করা হয়। সহকারী কমিশনার হাসিবুল আজমকে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসনে বদলি করা হয়েছে। এডিসি জেনারেল সুফল চন্দ্র গোলদারকে ওএসডি করে মানবসম্পদ শাখায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হয়। এছাড়া সিনিয়র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সমাপ্তি রায়ের গাড়ি ব্যবহারের অনুমতি কেড়ে নেন ডিসি।

বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দেখা দিলেও চাকরি হারানোর ভয়ে কিংবা এসিআরে (কাজের বার্ষিক মূল্যায়ন রিপোর্ট) আপত্তিকর প্রতিবেদনের ভয়ে মিডিয়ার কাছে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলছেন না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হিজলা-মুলাদী ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সরকারি নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তারা রিসিভ করেননি। ফলে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সূত্র আরো জানায়, গত ৩০ ডিসেম্বর রিটার্নিং অফিসারের কন্ট্রোল রুম, ফলাফল সংগ্রহ, পরিবেশন, রিটার্নিং অফিসার ও তার দপ্তর, নির্বাচন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত পর্যবেক্ষক টিমসহ বিভিন্ন খাতে বরাদ্দকৃত ১৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কাজে তিনি তা ব্যয় না করে ভুয়া ভাউচারে পুরো টাকাই আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলা প্রশাসকের অনুকূলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ অন্যদের আপ্যায়ন, যানবাহনের জ্বালানির জন্য ৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। উল্লিখিত অর্থ পুরোটাই তিনি (ডিসি) আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একইসঙ্গে ৯ ফেব্রুয়ারি অন্যান্য মনিহারি, আপ্যায়ন ব্যয়, জ্বালানি তেল এবং প্রচার ও বিজ্ঞাপন বাবদ রিটার্নিং অফিসারের অনুকূলে পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। উল্লিখিত টাকার সামান্য পরিমাণ খরচ করা হলেও ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে প্রায় পুরোটাই আত্মসাৎ করেন তিনি।

অন্যদিকে ২৬ মার্চ উদযাপন উপলক্ষে স্থানীয় উৎস থেকে সংগৃহীত সাড়ে ১৭ লাখ টাকা ব্যবহারেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে এ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।

এছাড়া ডিসি বাংলোর সংস্কারের জন্য ত্রাণ তহবিল থেকে একাধিক প্রকল্প দেখিয়ে প্রায় আট লাখ টাকা বরাদ্দ নেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। সূত্র জানায়, টিআর নীতিমালা অনুযায়ী ত্রাণ শাখা থেকে টিআর বরাদ্দ করে ডিসির বাংলোর কাজ করানোর কোনো সুযোগ নেই। এসব অভিযোগের ব্যাপারে যথাযথ নথিপত্র আমার দেশ প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।

এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আমার দেশকে বলেন, ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জেলা প্রশাসক হিসেবে বরিশালে যোগদান করেই খায়রুল আলম সুমন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ অন্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করেন। বিশেষ করে নির্বাচনি কাজে নির্বাচন কমিশনের বরাদ্দকৃত অর্থ সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যবহার না করে নিজেই তা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এর প্রতিবাদ করায় অনেককেই মাশুল গুনতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রশাসন চালাতে হলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করতে হয়। তার সঙ্গে যোগাযোগ বা আলোচনা না করে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড চালানো সম্ভব হয় না। কিন্তু নির্বাচনি কাজে বরাদ্দকৃত অর্থ চাওয়ার কারণেই তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হন জেলা প্রশাসক। এর জেরে তিনি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের তার কক্ষে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

এ বিষয়ে বরিশাল জেলা প্রশাসকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাকে গত এক সপ্তাহ ধরে অসংখ্যবার ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। এমনকি তার হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করলেও কোনো সাড়া মেলেনি। ফলে অভিযোগের বিষয়গুলোয় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...