সন্তান ও পরিবার থাকা সত্ত্বেও জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একাকী ও অসহায় দিন কাটাচ্ছেন ৭০ বছরের বেশি বয়সি ‘ফুলি’। শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়ায় তিনি নিজের নাম-পরিচয়ও ঠিকমতো বলতে পারছেন না।
গতকাল শুক্রবার রাত সোয়া ১০টার দিকে সামাজিক সংগঠন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের তত্ত্বাবধানে ওই বৃদ্ধাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পর সংগঠনটির পক্ষ থেকে তার প্রয়োজনীয় ওষুধ, খাবার, পানি, চাটাই, বালিশসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত বুধবার বিকেলে সরাইল সদর ইউনিয়নের বড্ডাপাড়া গরুর বাজারের সামনে অসুস্থ অবস্থায় পড়ে ছিলেন বৃদ্ধা ফুলি। খবর পেয়ে সরাইল সদর ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল জব্বার তাকে উদ্ধার করে সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। সেখানে দুই দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্সচালক জাকিরুল ইসলাম ও স্বাস্থ্যকর্মী রাসেল চৌধুরী তাকে উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, এর আগেও বৃদ্ধা ফুলি দীর্ঘদিন অসুস্থ অবস্থায় সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সে সময় তার ছেলে বাঁশের মই দিয়ে বহন করে তাকে বাড়িতে নিয়ে যান। কিন্তু এবার হাসপাতালে ভর্তি করার পর আর তাকে নিতে আসেননি তিনি এবং এখন পর্যন্ত তার কোনো খোঁজখবরও নিচ্ছেন না।
সরাইল সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল জব্বার জানান, ‘সরাইল গরুর বাজার এলাকায় এক অসুস্থ বৃদ্ধা পড়ে থাকার খবর পেয়ে আমরা দ্রুত সেখানে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করি। তার বাড়ি সরাইল সদরের উচালিয়াপাড়া গ্রামে এবং তার একটি ছেলে রয়েছে। তবে ছেলেটিকে এখনো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা তার সন্ধান চালাচ্ছি। ছেলেকে পাওয়া গেলে মায়ের বিষয়ে বিস্তারিত জেনে প্রয়োজনীয় আইনি ও সামাজিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে বৃদ্ধার এমন অসহায়ত্বে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. আজাহার উদ্দিন জানান, বৃদ্ধার সন্তান বা পরিবারের কোনো স্বজন দায়িত্ব নিতে এগিয়ে না এলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের উদ্যোগে তার চিকিৎসা চালিয়ে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করা হবে। পরবর্তীতে তার জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করা হবে।
তিনি বলেন, একজন বৃদ্ধা মা যেন সন্তানের অবহেলায় জীবনের শেষ দিনগুলো একাকিত্ব ও কষ্টে কাটাতে বাধ্য না হন—এটি শুধু তার পরিবারের নয়, আমাদের সবার মানবিক দায়িত্ব। যে মা-বাবা সন্তানকে স্নেহে আগলে বড় করেন, অসুস্থ হলে রাত জেগে সেবা করেন এবং নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে মানুষ করেন—বৃদ্ধ বয়সে সেই মা যখন অসহায় হয়ে হাসপাতালের বিছানায় পড়ে থাকেন, তখন তার পাশে দাঁড়ানো সন্তানের প্রাথমিক দায়িত্ব। সংশ্লিষ্ট সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের দ্রুত বৃদ্ধা মায়ের দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি তার পরিচয় ও পরিবার খুঁজে পেতে সহায়তার জন্য সমাজের সচেতন মানুষদের এগিয়ে আসার অনুরোধ করা হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

