চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় র্যাব ও পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্পে হামলার আগে সন্ত্রাসীরা অন্তত পাঁচটি স্থানে এক্সকাভেটর দিয়ে রাস্তা কেটে ফেলেছিল—এমন দৃশ্য আমার দেশের হাতে আসা ছবি ও ঘটনার বর্ণনায় স্পষ্ট হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় গাড়ি চলাচল একেবারে অচল করে দিতে রাতভর মাটি কেটে রাস্তার মাঝখানে বড় বড় গর্ত তৈরি করা হয়। ক্যাম্পে অতর্কিত হামলার আগ মুহূর্তে এই কৌশলগত নাশকতাই হামলাকারীদের পরিকল্পনার সুস্পষ্ট প্রমাণ বলে মনে করছে যৌথ বাহিনী।
রোববার রাত ১০টার পর থেকেই রাস্তা কাটার কাজ শুরু হয়। স্থানীয়রা জানান, এক্সকাভেটর থামেনি প্রায় তিন ঘণ্টা। রাস্তার পাঁচটি পয়েন্টে প্রায় চার ফুট গভীর করে কেটে ফেলা হয় পুরো পাটাতন। কাটাছেঁড়া মাটির ঢিবি এমনভাবে ছড়িয়ে রাখা হয়, যাতে জরুরি মুহূর্তে র্যাব–পুলিশের গাড়ি সামনে এগোতে না পারে।
আর সেই পরিকল্পনার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন ঘটে রাত ১টার দিকে, যখন জঙ্গল সলিমপুর ও পাশের আলীনগরের অস্থায়ী ক্যাম্প দুটি একই সময়ে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রধারী একটি সশস্ত্র দল আক্রমণ করে।
অভিযানে অংশ নেওয়া র্যাব ৭ এর ডেপুটি সহকারী পরিচাল কামাল হোসাইন জানান, ‘রাস্তা কেটে তাঁরা পুরো এলাকা অবরুদ্ধ করে দেয়। গাড়ি তো দূরের কথা, মোটরসাইকেলও ঢুকতে পারছিল না। ভেতরে থাকা সদস্যদের ওপর হঠাৎ হামলা চালানোই ছিল তাঁদের মূল পরিকল্পনা।’
রাস্তা কাটার জন্য যে এক্সকাভেটরটি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি পরে ঘটনাস্থলের কাছেই পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। সরু পাহাড়ি রাস্তায় এভাবে ভারী যন্ত্র দিয়ে নাশকতা চালানো—এ ধরনের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়নি বলেই জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে রাতভর তীব্র গুলিবর্ষণ
রাস্তা কেটে পালানোর সুবিধা নিশ্চিত করার পর হামলাকারীরা মধ্যরাতে দুই ক্যাম্পকে ঘিরে ফেলে। র্যাব সদস্যদের ভাষ্য—একে-৪৭ ধাঁচের ভারী অস্ত্র ব্যবহার করা হয় হামলায়। রাত ১টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত গুলি বিনিময় চলে। টিনশেড ক্যাম্পের কাঠামোতে একাধিক স্থানে গুলিবিদ্ধ চিহ্ন দেখা গেছে।
এক র্যাব সদস্য বলেন, ‘হঠাৎ চারদিক থেকে গুলি শুরু হয়। আমাদের সদস্যরা দ্রুত অবস্থান বদলে পাল্টা গুলি চালান, নইলে হতাহতের সংখ্যা বাড়ত।’
অন্ধকার, বৃষ্টি আর পাহাড়ের কাদা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল পুরোপুরি প্রতিকূল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, রাত ১২টার পর এলাকায় বৃষ্টি শুরু হলে পাহাড়ি ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে হামলাকারীরা নেমে আসে। বৃষ্টির শব্দে অস্ত্রের প্রাথমিক শব্দ ঢাকা পড়ে যায়। বৃষ্টিকে আড়ালে রেখে তাঁরা ক্যাম্পের বেশ কাছে পৌঁছে যায়।
অন্যদিকে র্যাব–পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্পে স্থায়ী ব্যারাক তৈরি না হওয়ায় সদস্যদের বড় অংশই পাশের একটি স্কুল ভবনে থাকতেন। হামলাকারীরা এই বিষয়টি জানত বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ভোরে পাঁচ শতাধিক সদস্যের অভিযান, পায়ে হেঁটে ঢুকে পড়ে বাহিনী
হামলাকারীরা পালিয়ে গেলে ভোর ৫টার পর র্যাব–পুলিশ যৌথবাহিনীর পাঁচ শতাধিক সদস্য অভিযান শুরু করেন। রাস্তা কেটে ফেলা হওয়ায় যান্ত্রিক বাহন ব্যবহার সম্ভব হয়নি। হেঁটে হেঁটে ৩০ হাজার একর পাহাড়ি এলাকা ঘিরে ফেলে বাহিনী। দুর্গমতা, কাদা আর পাহাড়ি গাছপালার কারণে অভিযান এখনো চলছে। কয়েকজন সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়েছে।
এক্সকাভেটর শুধু রাস্তা কাটতেই নয়—র্যাব ক্যাম্পের সীমানাপ্রাচীর ভাঙার চেষ্টাও করা হয়েছিল—এমন দাবি করেছেন একটি নিরাপত্তা সূত্র। ছবিতে দেখা যায়, প্রাচীরের একটি অংশ ভেঙে পড়েছে। ক্যাম্পটি তিনদিক থেকে ঘিরে গুলি ছোঁড়া হয় বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। এই সমন্বিত হামলার ধরন ইঙ্গিত দেয়—এটি ছিল দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত নাশকতা।
জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সরকার পুলিশ ট্রেনিং একাডেমি, জেলা কারাগারসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ঈদের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এলাকা পরিদর্শনে আসার কথা ছিল। প্রকল্প ঘোষণার আগে থেকেই একটি সংগঠিত গোষ্ঠী স্থানীয়দের উচ্ছেদ আতঙ্ক দেখিয়ে উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করছিল—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
সাম্প্রতিক এই হামলা সেই উত্তেজনারই চূড়ান্ত রূপ হতে পারে বলে মনে করছে নিরাপত্তা বাহিনী।
‘আমাদের সদস্যরা নিরাপদে, হামলাকারীরা ভারী অস্ত্র ব্যবহার করেছে’
র্যাব–৭ এর কমান্ডিং কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘এটি ছিল পরিকল্পিত হামলা। রাস্তা কেটে ফেলার মধ্য দিয়ে তারা আগেই নিজেদের সুবিধা নিশ্চিত করেছে। আমাদের সদস্যরা নিরাপদ আছেন, এবং আমরা পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাঁদের শনাক্ত করতে কাজ চলছে। প্রয়োজন হলে আরও বৃহৎ অভিযান চালানো হবে।’
দিনভর এলাকাজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা গেছে। ভাঙা রাস্তা, এক্সকাভেটরের কাটাছেঁড়া মাটি ও ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাম্প দেখে অনেকেই বিস্মিত। স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, ‘এমন দৃশ্য কোনো দিন দেখিনি—পাহাড় কেটে রাস্তা উধাও, পাশে গুলির শব্দ, রাতভর বিশৃঙ্খলা।’
সামগ্রিকভাবে এই হামলা দেশের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে সংগঠিত পাহাড়ি নাশকতা হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
জেলার পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, “হামলার আগে সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে কয়েক জায়গায় রাস্তা কেটে ফেলেছিল। এটা এমনভাবে করা হয়েছে যে আমাদের গাড়ি কোনোভাবেই সামনে এগোতে নাপারেনি। আমরা পায়ে হেঁটে সদস্য পাঠাই। রাতভর গুলিবর্ষণের পর ভোরে তারা পালিয়ে যায়। এখন পুরো এলাকা ঘিরে অভিযান চলছে।”
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের সমন্বিত হামলা চালাতে হলে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি লাগে। কারা এর সঙ্গে জড়িত, সেটি আমরা খতিয়ে দেখছি। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
এদিকে এ হামলার ঘটনা ঘটল এমন সময়ে, যখন আগামী ৩১ মে জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনের ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। রোববার সকালে তার সফরসূচি সম্পর্কে অবহিত হয় প্রশাসন। তারপর ওইদিন রাতেই এই হামলা হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

