কনটেইনার টার্মিনাল ইজারা নিয়ে ফের উত্তপ্ত চট্টগ্রাম বন্দর

কনটেইনার টার্মিনাল ইজারা নিয়ে ফের উত্তপ্ত চট্টগ্রাম বন্দর

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও ওভারফ্লো ইয়ার্ড ১৫ বছরের জন্য আন্তর্জাতিক অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বন্দর এলাকা। দেশের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার উদ্যোগকে দেশের স্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়ে বন্দর রক্ষা কমিটিসহ বিভিন্ন শ্রমিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন নতুন করে আন্দোলনে নেমেছে।

দুই বছর ধরে চলা এই আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্তে। গত ১ অক্টোবর এনসিটি ও ওভারফ্লো ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক অপারেটরের মাধ্যমে ১৫ বছর পরিচালনার জন্য খসড়া কনসেশন চুক্তিতে নীতিগত অনুমোদন দেয় সরকার। এর পরদিন থেকেই চুক্তির প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে বন্দর রক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন সংগঠন।

বিজ্ঞাপন

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। এখানে গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার টার্মিনালের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘ সময়ের জন্য কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার আগে এর অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও জাতীয় নিরাপত্তার দিকগুলো গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বন্দর রক্ষা কমিটিসহ আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর নেতারা জানান, বন্দর শুধু পণ্য ওঠানামার অবকাঠামো নয়; এটি দেশের অর্থনীতি ও কৌশলগত নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত, মেয়াদ, আর্থিক সুবিধা এবং জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলো জনসমক্ষে স্পষ্ট করা জরুরি।

শ্রমিক নেতাদের ভাষ্য, চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ কোনো স্থাপনার নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক, বন্দর ব্যবহারকারী ও অংশীজনদের মতামত নেওয়া দরকার। তাদের আশঙ্কা, বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে টার্মিনাল পরিচালনা শুরু হলে স্থানীয় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, শ্রম অধিকার এবং বন্দরের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

আন্দোলনকারীরা জানান, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। ফলে এনসিটি ও ওভারফ্লো ইয়ার্ডের পরিচালনা নিয়ে সরকারের উদ্যোগ এবং আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর মুখোমুখি অবস্থানে বন্দরে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যেভাবে শুরু

এনসিটি বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে প্রকাশ্য বিরোধিতা ও আন্দোলন শুরু হয় ২০২৪ সালের শেষ দিকে। এর আগে আওয়ামী সরকারের আমলেই এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি অপারেটরের কাছে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তখন সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম আলোচনায় আসে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। তারাও এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ দেখালে বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিষয়টি দর-কষাকষির পর্যায়ে গেলেও শ্রমিক আন্দোলন ও আলোচনা কমিটির সদস্যদের আপত্তির মধ্যে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রক্রিয়াটি স্থগিত হয়ে যায়।

এরপর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও আলোচনা শুরু হয়। গত জুনে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারা নিয়ে দর-কষাকষি চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। সর্বশেষ ১ অক্টোবর চুক্তির খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়ার পর আন্দোলন নতুন করে তীব্র হয়।

দুই বছর ধরে আন্দোলন

২০২৪-এর ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে শ্রম সংস্কার কমিশনের আয়োজিত সভায় শ্রমিক নেতারা জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তুলে এনসিটিসহ বন্দরের কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় আপত্তি জানান। ২০২৫-এর মে’তে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল-বন্দরের প্রধান ফটকের সামনে দুই ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচি পালন করে।

একই বছরের সেপ্টেম্বরে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) চট্টগ্রাম বন্দরের মাল্টিপারপাস বার্থে সমাবেশ করে এনসিটি ও লালদিয়ার চর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বাতিলের দাবি জানায়। ১ নভেম্বর চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে দিনব্যাপী গণঅনশন করে স্কপ। ২২ নভেম্বর সংগঠনটির বিভাগীয় সম্মেলন থেকে বন্দর অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২৬ নভেম্বর আগ্রাবাদ, মাইলের মাথা ও বড়পোল এলাকায় প্রতীকী অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়।

২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল আট ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করে। এতে স্কপ সমর্থন দেয়। কর্মবিরতির কারণে এনসিটি, চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও কার্গো বার্থের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এরপর ৭ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিলসহ চার দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ঘোষণা দেয়। এর পরপরই ফেব্রুয়ারিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়।

পরে ৪ জুন সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলে আন্দোলন আবার জোরালো হয়। ১৮ জুলাই বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে পাঁচ ঘণ্টার প্রতীকী গণঅনশন করে। ২২ জুলাই চেরাগী পাহাড়ে সমাবেশ ও মিছিল করে সংগঠনটি।

সর্বশেষ ১ অক্টোবর এনসিটি ও ওভারফ্লো ইয়ার্ড ১৫ বছরের জন্য আন্তর্জাতিক অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনার খসড়া কনসেশন চুক্তিতে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর ৪ অক্টোবর স্কপ মানববন্ধন ও সমাবেশ করে। ৫ অক্টোবর বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। কর্মসূচি থেকে ১৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের কার্যালয় ঘেরাওয়ের হুমকি দেওয়া হয় সংগঠনটির পক্ষ থেকে।

কেন এই আন্দোলন

আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর নেতারা জানান, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। তাই বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব, শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, অনেক বছর ধরে দেশের জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত আছি। এনসিটিকে দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়ার আগে একটি সামগ্রিক ও স্বচ্ছ তুলনামূলক মূল্যায়ন প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। এতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় টার্মিনালটির সম্ভাব্য রাজস্ব, সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ, আধুনিক প্রযুক্তি ও অটোমেশনের ব্যবহার, কর্মদক্ষতা এবং প্রস্তাবিত ইজারা থেকে রাষ্ট্রের সম্ভাব্য আর্থিক সুবিধার বিষয়গুলো থাকা দরকার।

তিনি বলেন, সরকার যখন অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মতো বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন এনসিটি ও সিসিটির মতো কৌশলগত অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদে ইজারায় দেওয়ার জন্য কেন তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে, তা জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করা উচিত।

বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও শ্রমিক নেতা হুমায়ুন কবির বলেন, বন্দর নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসা উচিত। সংশ্লিষ্টদের মতামত না নিয়ে এনসিটি ইজারা দেওয়া হলে দেশ ও শ্রমিকদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে। তিনি বলেন, বন্দর দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল জায়গা। সরকার জনগণের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি করবে না বলে তারা আশা করেন।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এনসিটি

চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় এনসিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গত অর্থবছরে এই টার্মিনাল দিয়ে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার ওঠানামা হয়েছে, যা বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ।

চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে কনটেইনার উঠানো-নামানোর চারটি প্রধান টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড়। এটির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন শুধু বন্দর কর্তৃপক্ষ বা শ্রমিকদের বিষয় নয়; দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, ব্যবসার ব্যয় ও সামগ্রিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

বর্তমানে এনসিটি বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেডের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বিদেশি অপারেটরের কাছে হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানটিই টার্মিনাল পরিচালনা করবে। বন্দরের অন্য প্রধান টার্মিনালগুলোর মধ্যে জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) ও চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) দেশীয় অপারেটররা পরিচালনা করছে। আর পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনা করছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল (আরজিসিটিওয়াই)।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন