কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে গোসলে নেমে ভেসে যাওয়া পর্যটকদের জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব পালন করেন লাইফ গার্ডের কর্মীরা। তবে তারা সরকারি বেতনভুক্ত কর্মচারী নন। একটি বেসরকারি সংস্থার হয়ে সৈকতের পর্যটকবহুল এলাকাগুলোয় দায়িত্ব পালন করেন। সমুদ্রে নামতে যাওয়া পর্যটকদের সতর্ক করা এবং গোসলে নেমে বিপদে পড়া পর্যটকদের উদ্ধারের কাজটি তারাই করেন। তবে আর্থিক সংকটে পুরো কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে। তবে আপাতত আগামী তিন মাসের জন্য জীবন পেয়েছে লাইফ গার্ড।
সূত্রমতে, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ও আশপাশের এলাকায় ‘সি-সেফ’ লাইফ গার্ডের কার্যক্রম আর্থিক সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। দাতা সংস্থা রয়াল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউটের (আরএনএলআই) অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ৩০ সেপ্টেম্বর। ফলে আগামী ১ অক্টোবর থেকে লাইফ গার্ডের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
তবে শঙ্কার মাঝেও একটি সুসংবাদ এসেছে। আর্থিক সংকট থাকলেও আগামী তিন মাস আগের মতোই এ কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও সি-সেফ লাইফ গার্ড সংস্থা। আর এ তিন মাসে অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে লাইফ গার্ড কার্যক্রম স্থায়ী করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এজন্য দাতা সংস্থা, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সার্বিক যোগাযোগের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত কার্যকরের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
সি-সেফ লাইফ গার্ডের টিম ম্যানেজার ইমতিয়াজ আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, ১ অক্টোবর থেকে সৈকতে লাইফ গার্ড কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করে তা আরো তিন মাস চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, এজন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অনুরোধপত্র দেওয়া হবে। আর এ অনুরোধপত্র নিয়ে দাতা সংস্থা রয়াল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউটের (আরএনএলআই) সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো বা ভিন্ন প্রকল্পের টাকা ব্যয় করে অর্থ বরাদ্দের চেষ্টা চলবে।
ইমতিয়াজ বলেন, দাতা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে পর্যটনসংশ্লিষ্ট আবাসিক হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউসের মালিকদের কাছ থেকে সহায়তা নিয়ে আর্থিক সংকট কাটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে জেলা প্রশাসন।
তিনি বলেন, সি-সেফ লাইফ গার্ড ২৭ জন কর্মী দিয়ে কার্যক্রমটি পরিচালনা করে আসছিল। এর জন্য প্রতি মাসে ব্যয় হয় ১৪ লাখ টাকা। আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছা করলে এ অর্থ দিতে পারে। বিনিময়ে সৈকতের বালিয়াড়িজুড়ে আমরা আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম, যোগাযোগ নম্বরসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে প্রচার চালাতে পারি।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পর্যটন-২ শাখার যুগ্ম সচিব একেএম মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি স্মারকে গত ২৭ আগস্ট লাইফ গার্ড পরিচালনাসহ দুটি নিদের্শনা প্রদান করা হয়, যা কক্সবাজার জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে আটটি বিভাগে এর অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।
তাতে বলা হয়, সমুদ্র সৈকত এলাকায় প্রতি বছর পর্যটকদের অসচেতনতা ও লাইফ গার্ড সার্ভিস চালু না থাকায় প্রায়ই পানিতে তলিয়ে পর্যটকের মৃত্যুসহ নানারকম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে থাকে। পর্যটকরা সমুদ্রে নামার সময় তাদের সঙ্গে লাইফ গার্ড না থাকায় জোয়ার-ভাটাসহ চোরাবালিতে আটকে যাওয়ার মতো দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।
তথ্যমতে, ওই সব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধকল্পে নিরাপদ সমুদ্র পর্যটন নিশ্চিতকরণে সমুদ্র সৈকত এলাকায় লাইফ গার্ড সার্ভিস প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। পর্যটকসংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার অংশ হিসেবে হোটেল-মোটেল, গেস্ট হাউস ও রিসোর্টের মালিকরা লাইফ গার্ড নিযুক্ত করে তাদের বেতন-ভাতাসহ আনুষঙ্গিক সুবিধাদি প্রদানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
অপর স্মারকটির বিষয় নিরাপদ সমুদ্র পর্যটন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে পর্যটকদের লাইফ জ্যাকেট সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিকরণ।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. শাহিদুল আলম গণমাধ্যমকে জানান, লাইফ গার্ড কার্যক্রম আপাতত বন্ধ হচ্ছে না। আগামী তিন মাস স্বাভাবিক কার্যক্রম থাকবে। এর মধ্যে দাতা সংস্থা বা মন্ত্রণালয়ের নিদের্শনামতে আবাসিক প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে স্থায়ী অর্থ সংগ্রহ করা হবে।
তিনি বলেন, কক্সবাজার পর্যটন শহর। এখানে মানুষ ভ্রমণে আসবেন, সমুদ্র স্নান করবেন। তাদের নিরাপত্তা জরুরি। তাই লাইফ গার্ড কার্যক্রমকে স্থায়ী করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সি-সেফ লাইফ গার্ড জানিয়েছে, ২০১২ সাল থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে এবং ২০১৪ সাল থেকে পাইলট প্রজেক্টের মাধ্যমে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। শুরু থেকেই ২৭ জন দক্ষ কর্মী বিভিন্ন শিফটে ভাগ হয়ে সাগরে ভেসে যাওয়া মানুষদের উদ্ধারে কাজ করে যাচ্ছেন।
সমুদ্রে গোসলে নেমে গত এক বছরে ১১ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে এবং উদ্ধার করা হয়েছে ৭৮ জনকে। তাছাড়াও গত এক দশকে ৬৩ জনের মৃত্যু এবং ৭৮২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

