চাঁদাবাজি-হুমকি-খুনে অস্থির চট্টগ্রাম

চাঁদাবাজি-হুমকি-খুনে অস্থির চট্টগ্রাম

ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে গত ১৬ আগস্ট। তবে নির্বাচিত সরকার আসার পরও গত ছয় মাসে (ফেব্রুয়ারি-আগস্ট) আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেনি বলে পুলিশের নিজস্ব পরিসংখ্যান ও অনুসন্ধানে জানা গেছে। ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষÑ সবাই এখন সন্ত্রাসীদের চাঁদা দাবি, গুলি ও হত্যার হুমকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইÑএই ছয় মাসে সারা দেশে হত্যা মামলা হয়েছে ১,৭৮৯টি, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি। আগের বছরের একই সময়ে সংখ্যাটি ছিল ১,৫৮৫টি; অর্থাৎ হত্যা মামলা বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম রেঞ্জেই রেকর্ড হয়েছে ৩৬১টি হত্যা মামলা, যা ঢাকা রেঞ্জের (৪০৪টি) পর সর্বোচ্চ।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে গত মে পর্যন্ত নগরে অন্তত ১২৫টি খুনের মামলা হয়েছে। শুধু চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই নগরে খুন হয়েছেন অন্তত ২৫ জন। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ের ৩৫টি আলোচিত গুলি ও খুনের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এর মধ্যে ২২ জনকেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ঘুরেফিরে অন্তত ১৩ জন শুটার বা অস্ত্রধারীর নাম এসেছে, যদিও নগরজুড়ে ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক শুটার সক্রিয় বলে পুলিশের ধারণা।

জেলার রাউজান উপজেলার চিত্র আরো উদ্বেগজনক। গত ২৩ মাসে সেখানে ২৮টি খুনের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১৮ জনই বিএনপির নেতাকর্মী। তারা দলীয় কোন্দল ও এলাকা-নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্বে নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আবার এসব হত্যার ১৫টিই ঘটেছে প্রকাশ্য দিবালোকে, জনসমাগমের মধ্যে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে উত্তেজিত জনতার পিটুনিতে (মব সহিংসতা) নিহত হয়েছেন ১৩৪ জন, যার মধ্যে চট্টগ্রামেই ৩১ জনÑ যা ঢাকার (৫০) পরই সর্বোচ্চ।

চাঁদাবাজি, গুলি, লাল দাগসহ হুমকির বার্তা

চট্টগ্রাম শহরে বর্তমানে অন্তত আটটি আলোচিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয় বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তাদের বিরুদ্ধে নির্মাণাধীন ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ফুটপাত, গ্যারেজ, বালুমহাল ও পরিবহন খাত থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। চাঁদা না দিলে বাসায় গুলি, দরজায় লাল রঙে দাগ কেটে রাখা, আবার কোথাও সরাসরি ফোনে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।

পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত নগরে চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে ৬৮টি। একই সময়ে অন্তত ৪০টির বেশি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে অক্সিজেন, বালুচরা, হামজারবাগ, চন্দনপুরা, চান্দগাঁও, বাদুরতলা, খুলশী, বার্মা কলোনি, বাকলিয়া ও কালুরঘাট এলাকায়। শুধু চান্দগাঁও ও পাঁচলাইশ থানাতেই জুলাই বিপ্লবের পর প্রথম ১৭ মাসে চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে ১৫টি, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি। ভুক্তভোগীদের অনেকেই ভয় ও ঝামেলার কারণে অনেকেই থানা পর্যন্ত যান না।

এমন পরিস্থিতিতে গত ১৪ জুলাই চট্টগ্রামের একদল ব্যবসায়ী চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। তার আগের দিন বাকলিয়ায় একটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে সাড়ে ৩৫ লাখ টাকা লুট করার অভিযোগ ওঠে। প্রতিষ্ঠানটির মালিকের কাছে দুই দিন আগে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় জড়িত হিসেবে শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের নাম আসে। পরে এই ঘটনার পরপর যশোর থেকে বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।

চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র হামলা ও প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চকবাজার থানার চন্দনপুরা এলাকায় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে চাঁদা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসীরা পিস্তল, এসএমজি, চায়নিজ রাইফেল ও শটগান নিয়ে হামলা চালায়। বাড়িটিতে পুলিশি পাহারা থাকা সত্ত্বেও সন্ত্রাসীরা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এর কয়েক মাস পর গত ১৩ জুন রাউজানের একটি বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে (৪৫)। বাজারের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দুটি ঘটনাই চট্টগ্রামে সশস্ত্র অপরাধীদের দাপটের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে।

এমনকি সরকারি অফিসেও নিয়মিত হামলা হচ্ছে । গত এক বছরে চট্টগ্রামে অন্তত ১০টি সরকারি দপ্তরে হামলা, ভাঙচুর, হুমকি ও সশস্ত্র মহড়ার ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে ৫টি গত ছয় মাসের ঘটনা। সর্বশেষ গত ২১ জুন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) চট্টগ্রাম কার্যালয়ে ঠিকাদারদের হামলার অভিযোগ ওঠে। এর তিন দিন আগে চট্টগ্রাম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর ইসলামের কার্যালয়ে ঢুকে তাকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ তৈরি হয়। এ অবস্থায় প্রশাসনকে দলনিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।

রাজনৈতিক সহিংসতা ও দলীয় নেতাকর্মী হত্যা

শুধু সাধারণ অপরাধই নয়, রাজনৈতিক কোন্দলেও প্রাণহানি ঘটছে চট্টগ্রামে। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে খোদ ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও। চট্টগ্রামে একের পর এক বিএনপি নেতাকর্মী নিহত হওয়ার পেছনে এলাকা-আধিপত্য, ফুটপাত ও ডিশ-ইন্টারনেট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদাবাজির ভাগ-বাটোয়ারার দ্বন্দ্বকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের চিত্রও উদ্বেগজনক। পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের দাবি অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সেখানে প্রায় ২৪০টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে অপহরণ, হত্যা, চাঁদাবাজি ও ভূমি দখলের মতো ঘটনা ঘটেছে।

চট্টগ্রাম নগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, দিনদুপুরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে হামলা, লুটপাট ও অস্ত্রবাজি চলছে, অথচ সরকার এসব ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। অন্যদিকে চট্টগ্রাম নগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, সন্ত্রাসীদের কারণে ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ অস্বস্তিতে আছেন। তাই তাদের কঠোর হাতে দমন করা উচিত।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেছেন, অস্ত্রসহ বেশকিছু সন্ত্রাসীকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে। নগরবাসীর আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে জেলা পুলিশের এসপি মাসুদ আলমের দাবি, তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর রাউজান ও সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী ডেভিড ইমনের মতো সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করেছেন। ফলে এখন আন্ডারওয়ার্ল্ড অনেকখানি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমে দাবি করেছেন, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে এবং প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে আরো কিছুটা সময় প্রয়োজন। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক মৌমিতা পাল বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ফলে ধর্ষণসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন