রাতে থানায় আটক, গভীর রাতে মুচলেকায় মুক্তি—এর কয়েক ঘণ্টা পরই দল থেকে বহিষ্কার। মাত্র এক রাতের ব্যবধানে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সহসভাপতি মো. ইসমাইল হোসেনকে ঘিরে সীতাকুণ্ডে তৈরি হয়েছে চাঞ্চল্য।
বৃহস্পতিবার রাতে সীতাকুণ্ড থানায় ব্যক্তিগত গাড়ি রাখা নিয়ে পুলিশের এক কনস্টেবলের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কির অভিযোগে তাকে আটক করা হয়। পরে রাত প্রায় ২টার দিকে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের জিম্মায় মুচলেকা নিয়ে পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়।
এর কয়েক ঘণ্টা পর শুক্রবার সকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ইসমাইল হোসেনকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ বহিষ্কারের ঘোষণা দেয় কেন্দ্রীয় যুবদল।
তবে পুলিশের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইসমাইল। তিনি দাবি করেন, কোনো কনস্টেবলের গায়ে তিনি হাত তোলেননি। বরং কনস্টেবল শফিকই তাকে ধাক্কা দিয়েছেন। ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে থানার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাতে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে সীতাকুণ্ড থানায় যান ইসমাইল হোসেন। গাড়িটি থানা প্রাঙ্গণে রাখা নিয়ে গাড়িচালক কনস্টেবল মো. শফিকের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়।
ইসমাইলের ভাষ্য, গাড়ি রেখে তিনি থানার পাশের মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়তে যান। এ সময় মোবাইল ফোন সাইলেন্ট থাকায় গাড়ি সরানোর জন্য কনস্টেবলের দেওয়া ফোনকল তিনি দেখতে পাননি। নামাজ শেষে থানায় ফিরে গাড়ি সরাতে দেরি হওয়ায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
পুলিশের অভিযোগ, এরপর গাড়ি সরানো নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে ইসমাইল কনস্টেবল শফিককে ধাক্কা দেন। এতে ওই কনস্টেবল আহত হন। পরে তাকে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ঘটনার পর ইসমাইল হোসেনকে আটক করে থানায় রাখা হয়।
পুলিশের দাবি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা শেষে রাত প্রায় ২টার দিকে লিখিত মুচলেকা নিয়ে ইসমাইলকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ সময় স্থানীয় বিএনপি নেতারা তার জিম্মাদার ছিলেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মুচলেকায় নিজের ভুল স্বীকার করে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটানোর অঙ্গীকার করেন ইসমাইল। তবে পুলিশের এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি।
ইসমাইল বলেন, গাড়ি সরাতে দেরি হওয়ায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করার পরও কনস্টেবল শফিক তার সঙ্গে কুরুচিপূর্ণ আচরণ করেন। এ সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। তার হাতে থাকা আংটির সঙ্গে কনস্টেবলের আঙুলের ঘষা লেগে আঘাত হয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, “ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে থানার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ফুটেজ দেখলেই প্রকৃত ঘটনা পরিষ্কার হবে।”
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের নেতা মো. শাহাব উদ্দিন রাজুসহ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য, গাড়ি সরানোকে কেন্দ্র করেই প্রথমে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়।
তারা কনস্টেবল শফিকের আচরণ নিয়েও অভিযোগ করেছেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
থানার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই শুক্রবার সকালে ইসমাইল হোসেনের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয় কেন্দ্রীয় যুবদল।
সংগঠনের সভাপতি আবদুল মোমেন মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়ন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে তাকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ বহিষ্কারের কথা জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ইসমাইলের বিরুদ্ধে এ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তার কোনো অপকর্মের দায় সংগঠন নেবে না বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে যুবদলের নেতা-কর্মীদের তার সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ইসমাইলের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
কেন্দ্রীয় যুবদলের সিদ্ধান্তের পর স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সদস্যসচিব ফজলুল করিম চৌধুরী বলেন, ইসমাইল দলের একজন ত্যাগী নেতা। ঘটনার বিষয়ে আরও যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন ছিল। তিনি ইসমাইলের বহিষ্কারাদেশ পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও যুবদল নেতার বহিষ্কারাদেশ পুনর্বিবেচনার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে সীতাকুণ্ড থানার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা বা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন অনেকে।
একদিকে পুলিশের দাবি, দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়ে কনস্টেবলকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনায় ইসমাইলকে আটক ও পরে মুচলেকায় মুক্তি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ইসমাইলের দাবি, তিনি কোনো পুলিশ সদস্যকে মারধর করেননি এবং ঘটনার প্রকৃত চিত্র সিসিটিভি ফুটেজেই স্পষ্ট হবে।
থানার ঘটনা ও পরবর্তী সাংগঠনিক বহিষ্কার নিয়ে সীতাকুণ্ডে এখন দুই পক্ষের বক্তব্যই আলোচনায় রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

