চমেক হাসপাতালে রোগীর চাপ, মেঝেতেই চলছে চিকিৎসা

চমেক হাসপাতালে রোগীর চাপ, মেঝেতেই চলছে চিকিৎসা

শয্যা ৩২টি, রোগী ৮২ জন। অতিরিক্ত ৫০ জনের ঠাঁই হয়েছে বারান্দা ও মেঝেতে। মাথার উপরে পর্যাপ্ত মশারি নেই, গরমে স্বস্তি দিতে ফ্যানও অপ্রতুল। স্যালাইন ঝোলানোর স্ট্যান্ড না পেয়ে কেউ তা ঝুলিয়েছেন জানালায়। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে এমনই সংকটের মুখে পড়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল।

বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রধান ভরসা হওয়ায় বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলা থেকে গুরুতর ও জটিল রোগীদের পাঠানো হচ্ছে চমেকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডেঙ্গুর বাড়তি চাপ। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার বাইরে রোগী ভর্তি হওয়ায় তৈরি হয়েছে তীব্র শয্যা সংকট।

বিজ্ঞাপন

চমেক হাসপাতালের ১৬ নম্বর মেডিসিন ওয়ার্ডের মহিলা ব্লককে গত জুলাইয়ে ডেঙ্গু কর্নার হিসেবে চালু করা হয়। সেখানে শয্যা রয়েছে মাত্র ৩২টি। অথচ গত বুধবার দুপুরে রোগী ভর্তি ছিলেন ৮২ জন। নির্ধারিত শয্যার আড়াইগুণের বেশি রোগী থাকায় ৫০ জনকে বারান্দা ও মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

সেখানে তাদের জন্য পর্যাপ্ত মশারি ও ফ্যান নেই। নেই স্যালাইন দেওয়ার পর্যাপ্ত স্ট্যান্ডও। ফলে কেউ জানালায় স্যালাইন ঝুলিয়ে রেখেছেন, কেউ ভ্যাপসা গরমে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন।

বারান্দায় মশারি ছাড়া শুয়ে থাকা রোগীদের জন্য ভোগান্তির পাশাপাশি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে এডিস মশা কামড়ানোর পর ওই মশার মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে পারে।

মহেশখালী থেকে আসা ডেঙ্গু রোগী মোহাম্মদ রফি বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর চমেক হাসপাতালে এসেছি। কিন্তু বেড খালি না থাকায় বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। খুব কষ্টে আছি।

ফটিকছড়ির বাসিন্দা আলামিন বলেন, আমার বাবা ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ায় হাসপাতালে এনেছি। কিন্তু এখানে জায়গা না থাকায় আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। আমরা গরিব মানুষ, কোথায় যাব?

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দীন বলেন, এই মুহূর্তে হাসপাতালের কোনো ওয়ার্ডেই খালি শয্যা নেই। সব ওয়ার্ডেই ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী। ডেঙ্গুর পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে রেফার হয়ে আসা রোগীর চাপও সামাল দিতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, চমেকের ওপর চাপ কমাতে প্রস্তাবিত ‘সিএমসিএইচ-২’ হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পুরোনো কলেজের পরিত্যক্ত জায়গায় হাসপাতালটি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে মূলত অস্ত্রোপচারসংক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হবে। চমেক একটি রেফারেল হাসপাতাল হওয়ায় শয্যা না থাকলেও রোগীদের ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। প্রয়োজনে মেঝেতেও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

নগরীর ২৫০ শয্যার চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালসহ অন্যান্য সরকারি হাসপাতালেও রোগীর চাপ বাড়ছে। সেখানেও বারান্দা ও মেঝেতে রোগীদের চিকিৎসা নিতে দেখা যাচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে চমেক হাসপাতালে।

এমন পরিস্থিতিতে সিআরবি এলাকার রেলওয়ে হাসপাতালকে ডেঙ্গুসহ মৌসুমি রোগের চিকিৎসায় ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে চালুর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, রেলওয়ে হাসপাতালটি এই কাজে ব্যবহার করা গেলে চমেকের ওপর চাপ কমবে এবং রোগীরা উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবেন।

তবে হাসপাতালটি ব্যবহারে প্রশাসনিক ও আর্থিক জটিলতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। তিনি বলেন, রেলওয়ে হাসপাতাল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন নয়। সেখানে প্রয়োজনীয় বাজেটও নেই। তারপরও বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সবশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে চট্টগ্রাম জেলার সরকারি হাসপাতালে ৪,১৮২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে মারা গেছেন ৯ জন। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছেন ৯১৩ জন, মারা গেছেন ১২ জন। সরকারি হাসপাতালে মৃত্যুহার ০.২১ শতাংশ, বেসরকারি হাসপাতালে ১.৩১ শতাংশ। অর্থাৎ রোগীর সংখ্যার তুলনায় বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যুহার সরকারি হাসপাতালের ছয়গুণেরও বেশি।

গতকাল পর্যন্ত চলতি বছরে চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৫,০৯৫ জন, মারা গেছেন ২১ জন। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৮৭ জন ডেঙ্গু রোগী। তাদের মধ্যে চমেক হাসপাতালে ৩০ জন, ফৌজদারহাট বিআইটিআইডিতে ১৪ জন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে আটজন, সিএমএইচে তিনজন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুজন এবং বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ৩০ জন। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সাজেদুর রহমান বলেন, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল। ওই মাসে আক্রান্ত হন ২,৪৩০ জন, যা বছরের মোট আক্রান্তের অর্ধেকেরও বেশি। একই মাসে মারা গেছেন ১৬ জন। তবে অক্টোবরের প্রথম সাত দিনে নতুন করে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

চমেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এএসএম জাহেদ বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগীদের পাশাপাশি গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। জ্বর হলে সাধারণ ভাইরাস জ্বর ভেবে অবহেলা না করে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো উচিত। আক্রান্ত হলে পূর্ণ বিশ্রামের পাশাপাশি পর্যাপ্ত তরল, ডাবের পানি, লেবুর পানি, খাবার স্যালাইন ও সাধারণ পানি পান করতে হবে। শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে হাসপাতালে যেতে হবে।

চট্টগ্রামের সরকারি হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপ ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যাওয়ায় ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক চিকিৎসাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আরো স্পষ্ট হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সিআরবির রেলওয়ে হাসপাতালকে দ্রুত ডেডিকেটেড ডেঙ্গু হাসপাতাল হিসেবে চালু করা গেলে চমেকের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি রোগীদের জন্য নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন