কক্সবাজার-ঢাকা রুট

দীর্ঘ যাত্রায় চালকের ক্লান্তি, বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকি

দীর্ঘ যাত্রায় চালকের ক্লান্তি, বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকি
ফাইল ছবি

দেশের সড়ক-মহাসড়কে একের পর এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য প্রাণ। সুস্থ শরীরে বাড়ি ফেরার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা করা মানুষ ফিরছেন নিথর লাশ হয়ে। দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে প্রশ্ন বাড়লেও কার্যকর সমাধান এখনো অধরা রয়ে গেছে।

পরিবহনসংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, দীর্ঘ সময় বিরতিহীন গাড়ি চালানো দুর্ঘটনার বড় কারণ। আবার অনেকে বলছেন, চালকের ক্লান্তির পাশাপাশি ট্রাফিক আইন অমান্য, বেপরোয়া গতি ও তদারকির অভাবও প্রাণহানির অন্যতম কারণ।

বিজ্ঞাপন

পর্যটন নগরী কক্সবাজার থেকে প্রতিদিন সবচেয়ে বেশি যাত্রীবাহী বাস চলাচল করে রাজধানী ঢাকার উদ্দেশে। এছাড়া রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর ও সিলেট রুটেও নিয়মিত দূরপাল্লার বাস যাতায়াত করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কক্সবাজার থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে সাধারণত ১২-১৪ ঘণ্টা সময় লাগে। যানজট না থাকলে কোনো কোনো বাস ১০ ঘণ্টার মধ্যেও গন্তব্যে পৌঁছে যায়।

অন্যদিকে কক্সবাজার থেকে সবচেয়ে দীর্ঘ পথ দিনাজপুর রুট। এই পথে একটি যাত্রীবাহী বাসের গন্তব্যে পৌঁছাতে কমপক্ষে ১৪-১৫ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন হয়।

দীর্ঘ এই যাত্রায় ঢাকাগামী বাস সাধারণত মাত্র দুবার এবং দিনাজপুরগামী বাস চারবার যাত্রাবিরতি দেয়। প্রতিটি বিরতি ২০-৩০ মিনিটের। এ সময় যাত্রীরা খাবার ও বিশ্রামের সুযোগ পেলেও চালকদের প্রকৃত বিশ্রাম হয় না।

খাওয়া-দাওয়া সেরে আবার স্টিয়ারিংয়ে বসতে হয় চালকদের। টানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি চালাতে চালাতে অনেকের চোখে ভর করে ক্লান্তি। বিশেষ করে রাতের যাত্রায় ঘুমের সঙ্গে লড়াই করেই দায়িত্ব পালন করেন তারা।

সাধারণ যাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অধিকাংশ দূরপাল্লার বাসে পর্যাপ্ত চালক না থাকায় একজন চালককেই পুরো পথ পাড়ি দিতে হয়। দীর্ঘক্ষণ বিরতিহীন গাড়ি চালানোর ফলে ঝিমুনি আসে, মনোযোগ কমে যায়। আর সেই সামান্য অসতর্কতাই মুহূর্তে কেড়ে নেয় বহু নিরীহ মানুষের জীবন।

কক্সবাজার-রাজশাহী রুটের বাসচালক আবদুর রহমান বলেন, একসময় দূরপাল্লার প্রতিটি বাসে দুজন চালক থাকতেন। একজন গাড়ি চালালে অন্যজন বিশ্রাম নিতেন। ফলে দীর্ঘ যাত্রার পরও চালকরা সতেজ থাকতেন, দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তুলনামূলক কম ছিল।

তার ভাষ্য, এখন অধিকাংশ বাসে একজন চালককেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টিয়ারিং ধরতে হয়। দীর্ঘ সময় বিরতিহীন গাড়ি চালাতে চালাতে একসময় শরীর-মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

আবদুর রহমান বলেন, ‘একজন চালক তো রোবট নন, তিনিও মানুষ। যাত্রাপথে অসুস্থ হলে বিকল্প চালক থাকে না। চলন্ত বাসে চালক অসুস্থ হওয়ার ঘটনা যেমন আছে, তেমনি গাড়ি চালানোর সময় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু মালিকপক্ষ অনেক সময় এসব বাস্তবতা গুরুত্ব দেয় না।’

শ্যামলী পরিবহনের কক্সবাজার জেলা ব্যবস্থাপক শামীমুল ইসলাম জানান, কক্সবাজার থেকে সবচেয়ে দীর্ঘ রুট দিনাজপুর। ১৪-১৫ ঘণ্টার এই যাত্রায় চারবার বিরতি দেওয়া হয়। ইনানী রিসোর্ট, কুমিল্লা, ঢাকা ও সিরাজগঞ্জে বাস থামে।

তবে চালকদের সক্ষমতা নিয়ে ভিন্নমত দেন শামীমুল ইসলাম। তিনি বলেন, বৈজ্ঞানিকভাবে একজন চালক টানা ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত গাড়ি চালাতে সক্ষম। রাতে ডিউটি থাকলে চালকরা দিনে এবং দিনে ডিউটি থাকলে রাতে ঘুমিয়ে বিশ্রাম নেন।

তার দাবি, একজন চালক টানা ছয় ঘণ্টা ঘুমাতে পারলে তিনি আবার পুরোপুরি কর্মক্ষম হয়ে ওঠেন। তাই দুর্ঘটনার জন্য শুধু দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোকে দায়ী করা ঠিক হবে না বলেও মনে করেন তিনি।

তিনি নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, আমি নিজে টানা ৬০ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে ইরাক থেকে ভারত এসেছি। চাইলে একটানা গাড়ি চালিয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে পারতাম। ভারত ঘুরে দেখব বলে সেখানে যাত্রাবিরতি করেছিলাম।

শামীমুল ইসলাম মনে করেন, শুধু একটানা গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটে না। আইন না মানার কারণে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে। চালকরা কেউ আইন মানতে চান না।

শামীমের ভাষায়, দেশের চালকদের মধ্যে প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। অনেক চালক বিআরটিএ থেকে অনৈতিক উপায়ে লাইসেন্স নেন। যেসব চালক সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ না নিয়ে রাস্তায় নামেন, তাদের হাতে তো দুর্ঘটনা ঘটবেই।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এস্তাফিজুর রহমান জানান, বর্তমানে মন্দার কারণে একজন চালক দিয়েই লম্বা পথে গাড়ি চালানো হচ্ছে। তেলের দাম বাড়লেও টিকিটের দাম বাড়ানো যায়নি। তাই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গাড়ির মালিকরা লম্বা যাত্রায় দুজন চালক দিতে পারেন না।

তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, লম্বা যাত্রায় যদি দুজন চালক থাকে, তাহলে দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে। চালকদেরও আরো বেশি সচেতন হয়ে গাড়ি চালাতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...