লাবুর ছোট্ট দোকানটি সাধারণ সময়ে এলাকার মানুষের চা-নাস্তার আড্ডার জায়গা। কিন্তু টানা বৃষ্টির পর আকস্মিক বন্যায় সেটিই এখন পরিণত হয়েছে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে। দোকানের নিচতলা ডুবে আছে পানিতে। সরু সিঁড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠতেই দেখা যায় একের পর এক পরিবার গাদাগাদি করে বাস করছে।
কেউ মেঝেতে চাদর বিছিয়ে বসে আছেন, কেউ কোলে শিশুকে নিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন। সবার চোখে একই প্রশ্ন—কবে নামবে পানি?
বাঁশখালীর গুনাগলি এলাকার ২ নম্বর ওয়ার্ডে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে প্রায় ৩০০টি বাড়ি। কোথাও কোমরসমান, কোথাও বুকসমান পানি। অনেক বাড়ির শুধু টিনের চাল দেখা যাচ্ছে। তিন দিন ধরে পানিবন্দি মানুষজনের অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা লাবুর দোকানের দ্বিতীয় তলায়।
সেখানে গেছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। দেখা হয় ৬৫ বছর বয়সী আহমেদ হোসেনের সঙ্গে। কালিপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা তিনি। ক্লান্ত চোখে জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন, তিন দিন আগে পানি উঠতে শুরু করে। প্রথমে ভাবছিলাম নেমে যাবে। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি বাড়তেই থাকে। শেষে ঘর ছেড়ে বের হতে হয়েছে।
সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে এখন তিনি এই অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের বাসিন্দা। তার ঘরের আসবাব, ধান, চাল, কাপড়—কী অবস্থায় আছে, সেটিও জানেন না। বাড়িতে যাওয়ার মতো কোনো উপায় নেই। তার কথায়, জীবনে অনেক বন্যা দেখেছি। কিন্তু এমন অসহায় কখনো লাগেনি।
লাবুর দোকানের এক কোণে বসে আছেন সাদিয়া সোলতানা। তার প্রসবের সময় ঘনিয়ে এসেছে। কিন্তু চারদিকে পানি। গুনাগলির সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অপেক্ষা করছেন কোনো গাড়ি পান কিনা।

স্বজনেরা উদ্বিগ্ন। হঠাৎ প্রসববেদনা শুরু হলে কীভাবে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হবে, সেই দুশ্চিন্তায় কাটছে প্রতিটি মুহূর্ত। বন্যার মধ্যে একজন প্রসূতি মায়ের এই অনিশ্চয়তা আশ্রয়কেন্দ্রের অন্যদেরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
হরদণ্ডী ইউনিয়নের বাসিন্দা ফারাছা বেগমের ঘরের চাল পর্যন্ত পানিতে ডুবে গেছে। ঘরে থাকার আর কোনো সুযোগ ছিল না। সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে তিনিও আশ্রয় নিয়েছেন লাবুর দোকানের দ্বিতীয় তলায়।
তিনি বলেন, কোনো কাপড়চোপড়ও আনতে পারিনি। বাচ্চাদের নিয়ে শুধু প্রাণ বাঁচিয়ে চলে এসেছি।
আশ্রয়কেন্দ্রে শিশুদের কান্না যেন থামছেই না। কারও খাবার দরকার, কারও দুধ। কেউ আবার ভয় পেয়ে মায়ের আঁচল আঁকড়ে ধরে আছে।
ছেলে, নাতি-নাতনিসহ আট সদস্যের পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন কিরণ বালা জলদাস। তাঁর পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্যটির বয়স মাত্র ২০ দিন। আরেকটি শিশুর বয়স পাঁচ বছর।
মাত্র ২০ দিনের নবজাতককে কোলে নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তায় থাকতে হচ্ছে পরিবারটিকে। শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় খাবার, পরিষ্কার কাপড়, নিরাপদ পরিবেশ—কোনোটিই পর্যাপ্ত নয়। বয়স্ক মানুষ আর ছোট ছোট শিশুদের একসঙ্গে একই কক্ষে থাকতে হচ্ছে।
ছয় মাস বয়সী সন্তানকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে বসেছিলেন পম্পি দাশ। শিশুটিকে বারবার শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। তিনি বলেন, ঘরে থাকলে অন্তত নিজের মতো করে থাকতে পারতাম। এখানে সবাই মিলে আছি। বাচ্চাটার কষ্ট বেশি হচ্ছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট এখন বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও শিশুদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী। অনেকের সঙ্গে অতিরিক্ত কাপড়ও নেই। রাতে ঘুমানোর জায়গা সংকুচিত হয়ে আসে। শিশুদের কান্না, বয়স্কদের উদ্বেগ আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত ভারী হয়ে উঠছে।
বাইরে তখনও থইথই পানি। ডুবে থাকা বাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে কেউ কেউ শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। কেউ ভাবছেন, ঘরে ফিরে কী পাবেন। কেউ আবার জানেন না, ঘরটি আদৌ বাসযোগ্য থাকবে কি না।
এই অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের মানুষগুলোর কাছে এখন সবচেয়ে বড় চাওয়া একটাই—পানি দ্রুত নেমে যাক, তারা আবার নিজেদের ঘরে ফিরতে পারেন। কিন্তু আকাশের দিকে তাকালে সেই অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হবে বলেই আশঙ্কা করছেন তারা।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

