ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে নোয়াখালী জেলাজুড়ে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। দীর্ঘদিন পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের প্রত্যাশায় মুখর এই জনপদ। ছয়টি আসনের সব কটিতে হেভিওয়েট প্রার্থী নিয়ে মাঠে নেমেছে বিএনপি; হারানো দুর্গ পুনরুদ্ধারে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অন্যদিকে সংগঠিত ও নিরবচ্ছিন্ন প্রচারের মাধ্যমে জয় ছিনিয়ে নিতে মরিয়া জামায়াতে ইসলামী। এর বাইরে ইসলামী আন্দোলন, এনসিপি ও খেলাফত মজলিসও ভোটের মাঠে ব্যাপক তৎপর।
৯টি উপজেলা ও আট পৌরসভা নিয়ে গঠিত নোয়াখালী জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে নির্বাচন ঘিরে চলছে ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম। মনোনয়ন ঘোষণার পর বঞ্চিত প্রার্থীদের সমর্থকদের একটি অংশ মনোনয়ন পুনর্বিবেচনার দাবিতে (নোয়াখালী ২, ৫ ও ৬ আসনে) বিক্ষোভ, মশাল মিছিল ও সমাবেশ করেছিল। তবে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মাহাবুব আলমগীর আলো ও সদস্যসচিব হারুনুর রশিদ আজাদ বলেন, তারেক রহমান দেশে ফেরার পর দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মী-সমর্থক উচ্ছ্বসিত, উজ্জীবিত এবং ঐক্যবদ্ধ। আমাদের মাঝে এখন কোনো ভেদাভেদ ও বিরোধ নেই। সবাই ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন।
অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ জোটের প্রার্থীরা সঙ্ঘবদ্ধভাবে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। দলটির নেতাকর্মী-সমর্থকেরাও বেশ উজ্জীবিত।
নোয়াখালী-১ (চাটখিল-সোনাইমুড়ী)
এ আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। সাবেক এই এমপি এলাকায় বেশ জনপ্রিয়। অন্যদিকে জেলা জামায়াতে ইসলামীর মজলিসে শূরা ও কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা ছাইফ উল্লাহ এই আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচন করবেন। এলাকায় গণসংযোগে তিনি মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ সব অপরাধ কার্যক্রম বন্ধ এবং মানবিক সমাজ বিনির্মাণের আশ্বাস দিচ্ছেন। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের জহিরুল ইসলাম, ইনসানিয়াত বিপ্লবের মশিউর রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মমিনুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির নুরুল আমিন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) রেহানা বেগম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নোয়াখালী-২ (সেনবাগ, সোনাইমুড়ী আংশিক)
এখানে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক নির্বাচনে লড়ছেন। এই আসন থেকে টানা পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত জয়নুল আবদিন এই হেভিওয়েট প্রার্থীর এলাকায় বেশ জনপ্রিয়। জনগণের সেবা, তারেক রহমান ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের আশ্বাস দিয়ে ধানের শীষে ভোট চাইছেন তিনি। এ আসনে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সেনবাগ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান কাজী মফিজুর রহমান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ছেন।
এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জেলা নায়েবে আমির অধ্যক্ষ সাইয়েদ আহমদ। তিনি নির্বাচনি এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ করেছিলেন। তবে জোটের শরিক এনসিপিকে এই আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এখানে এনসিপির প্রার্থী সুলতান মোহাম্মদ জাকারিয়া মজুমদার। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের তোফাজ্জল হোসেন, ইসলামী আন্দোলনের খলিলুর রহমান, জাতীয় পার্টির শাহাদাত হোসেন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ)
নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ নোয়াখালীর এই আসনে বিএনপির প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান, সাবেক মন্ত্রী বরকত উল্লাহ বুলু। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে তিনি এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বিগত সময়ের উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরে ধানের শীষে ভোট চাইছেন। জামায়াতে ইসলামীর জেলা সেক্রেটারি ও বেগমগঞ্জ উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা বোরহান উদ্দিন এই আসনে দাঁড়িপাল্লার কান্ডারি। তিনি নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন । সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তিনি মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, যানজট ও অবৈধ খাল দখলমুক্তসহ সব ধরনের অপরাধ নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এ আসনে খেলাফত মজলিসের মাওলানা মোরশেদ আলম মাসুম, জেএসডি থেকে সিরাজ মিয়া মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
নোয়াখালী-৪ (সদর-সুবর্ণচর)
সদর ও সুবর্ণচর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনটিও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান ধানের শীষ নিয়ে মাঠে লড়ছেন। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনটি নির্বাচনে তিনি এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। নিয়মিত সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠক ও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। জেলা জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ ইসহাক খন্দকার দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে মাঠে লড়ছেন। দাঁড়িপাল্লায় ভোট চেয়ে ব্যাপক সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। ভোটারদের কাছে গিয়ে উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন।
এছাড়া এই আসনে ইসলামী আন্দোলনের ফিরোজ আলম মাসুদ, গণঅধিকার পরিষদের আব্দুজ জাহের, ইনসানিয়াত বিপ্লবের ইউনুস নবী, জাতীয় পার্টির শরিফুল ইসলাম, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) থেকে বিটুল চন্দ্র তালুকদার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন।
নোয়াখালী-৫ (কোম্পানীগঞ্জ-কবিরহাট)
বিএনপির মরহুম ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও আওয়ামী লীগের পলাতক নেতা ওবায়দুল কাদের দুজনই এই আসনের বাসিন্দা। উভয়েই এই আসন থেকে একাধিকবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই আসনে এবার ধানের শীষ নিয়ে লড়বেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য ফখরুল ইসলাম। নির্বাচনি মাঠে তিনি ও তার সমর্থকরা ব্যাপক সক্রিয় রয়েছেন। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ বেলায়েত হোসেন এই আসনে দাঁড়িপাল্লার টিকিট পেয়েছেন। তিনি এলাকায় গণসংযোগ ও উঠান বৈঠকে বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
এছাড়া খেলাফত মজলিতের আলী আহমদ, ইসলামী আন্দোলনের আবু নাসের, জাতীয় পার্টির খাজা তানভীর আহমদ, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের শামসুদ্দোহা, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) মুনতাহার বেগম, জনতার দলের শওকত হোসেন, ইনসানিয়াত বিপ্লবের তৌহিদুল ইসলাম নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া)
দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় দল ও প্রতীকের চেয়ে ব্যক্তির প্রভাবটা ভোটের মাঠে বড় ফ্যাক্টর। চাকসুর সাবেক এজিএস ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম এই আসনে ধানের শীষের কান্ডারি। তিনি ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে উন্নয়নের নানা আশ্বাস দিচ্ছেন। এখানে বিএনপির প্রকৌশলী ফজলুল আজিম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটযুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন। এই আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট থেকে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ হাতিয়ায় নির্বাচনি মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তিনি এলাকার উন্নয়নে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন ভোটারদের।
এই আসনে জাতীয় পার্টির এটিএম নাবী উল্লাহ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) আব্দুল মোতালেব, গণঅধিকার পরিষদের আজহার উদ্দিন, ইসলামী আন্দোলনের নুরুল ইসলাম শরীফ, এলডিপির আবুল হোসেন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির আমিরুল ইসলাম আব্দুল মালেক এবং স্বতন্ত্র হিসেবে তানবীর উদ্দিন রাজীব নির্বাচনে লড়বেন।
সব মিলিয়ে নোয়াখালীর ছয়টি আসনেই জমে উঠেছে ভোটের লড়াই। ভোটাররা তাকিয়ে আছেন ব্যালট বিপ্লবের দিকে—কার দখলে যায় নোয়াখালীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


পুলিশের নির্যাতনে ট্রাকচালক নিহতের অভিযোগ